স্বপ্ন নাকি ইচ্ছা
২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০।
স্থান-সোহরাওয়ারদি উদ্যান।
আমি দুরু দুরু বুকে এগিয়ে চললাম সোহরাওয়ারদি উদ্যানের দিকে। আজ আমার জীবনের একটা অন্যতম দিন। আজ ওদের সাথে দেখা হবে। যদিও দুই জনের সাথে অনেক আগে একবার দেখা হয়েছিল, তারপরও ওটা স্মৃতি হয়ে গেছে।
হ্যাঁ, ঐতো ওদের দেখা যাচ্ছে। আমার মনে একটা শয়তানি মতলব ছিল। তাই সেই অনুযায়ী ছদ্মবেশ পরে এসেছিলাম। আমার পড়নে তখন ফুলহাতা হুডওয়ালা গেঞ্জি। হুডটা মাথার উপর দিয়ে, চোখে সানগ্লাস আর একটা নকল দাড়ি লাগিয়ে এসেছিলাম। আমি এগিয়ে গেলাম ওদের দিকে।
ওরা কারা সে সম্পর্কে আগে একটু বলে নেই.........প্রায় ৬ বছর আগে ওদের সাথে আমার পরিচয় হয় ফেসবুকে। পরিচয় হবার পর আমরা প্রায় একটা ফ্যামিলির মতো হয়ে যাই। রক্তের সম্পর্কের চেয়েও আমাদের অন্তরের পরিচয়ের সম্পর্কটা ছিল আরো দৃঢ়। সেই থেকে আমাদের পথ চলা। একটা গ্রুপ খুলে সেখানে রোজ আড্ডা দিতাম। ৫ জন দিয়ে গ্রুপ শুরু করে আজ আমাদের গ্রুপ মেম্বার সংখ্যা দাড়িয়েছে প্রায় লক্ষের ঘরে। এখানেই অনেক তরুন কবি, লেখক ও নতুন প্রতিভার জন্ম নেয়। আমি গ্রুপটি খুলতে পেরে এখন নিজেকে অনেক গর্বিত মনে করছি। নিজে জীবনে যা-ই করে থাকিনা কেন, মানুষের জন্য কিছু করতে পেরে খুব ভাল লাগছে। এই গ্রুপের নতুন প্রতিভারা এইবার একুশে বই মেলায় কয়েকটি স্টল দেয় গ্রুপের নামে। আমরা (ফ্যামিলি) আগে কখনো মিট করিনি। তাই এবার এই বইমেলা উপলক্ষে আমরা দেখা করার প্ল্যান করি। আজ সেই জন্যই বইমেলার পাশে সোহরাওয়ারদি উদ্যানে আমার আগমন ঘটলো।
আমি দেখলাম ওরা নির্দিষ্ট জায়গায় মাঠের উপর বসে আছে। প্রায় সবাই-ই আছে। মনে হয় কেউ আমাকে চিনতে পারলো না। আমার ছদ্মবেশের উদ্দেশ্য ছিল এটাই যাতে আমাকে কেউ না চেনে। দেখলাম মুন পু (আপু), তানজিলা পু, জাহিদ ভাই, অপু ভাই, আবিদ ভাই, মেমি, ইকু ভাই, তুষার ভাই, আতিকা পু আছে। প্রফেসর আবিদ তার সেই যথাযথ স্বভাবমতো রেসকোর্স ময়দানের উপর জাহিরকৃত বিদ্যা উগড়ে যাচ্ছে! কেউ গল্প করছে বা রসিকতা করছে।
আমি ওদের কাছে গিয়ে বললাম –“আরেহ, আপনারা বই এবং আড্ডা গ্রুপের মেম্বার না?” –“জি, হ্যাঁ। কিন্তু আপনাকে তো চিনলাম না।” মুন পু বলল। “আমি আপনাদের লেখার জন্য অপেক্ষিত এক ক্ষুদ্র পাঠক মাত্র।” চাপা মেরে বললাম আমি! (এখনো চিনতে পারে নাই!) –“ও আচ্ছা, তা এখানে কি মনে করে?” –“এইতো বইমেলায় যাচ্ছিলাম। পথে আপনাদের সাথে দেখা।” হঠাৎ পিছন থেকে আমার হুডটা নামিয়ে কে যেন আমার কান টেনে ধরলো। আউচ বলে পিছনে ফিরতেই দেখলাম বোকা পু! মিটিমিটি হাসতেছে। কিরে বাপ? কোনও ভুল করলাম নাকি! একটু খেয়াল করতেই দেখলাম যে হুডের ঘষায় আমার নকল দাড়ি কিছুটা উঠে গেছে! –“কিরে শয়তান, ডুবে ডুবে পানি খাবে আর কেউ টের পাবে না?” –“কি হইতেছে তাহিয়া আপু?” জাহিদ ভাই জিজ্ঞেস করলো। -“জাহিদ তোমরা চিনতে পারো নাই ইউ কে।” বলেই আমার দাড়ি ধরে টান দিলো। -“অউ অউ!” অপু ভাই এর যথারীতি ডায়ালগ। -“তবে রে হতভাগা!” তানজিলা পুর ধমক। মুন পু আর আবিদ ভাই হাসতেছে আর বাকিরা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। -“আমার জিএফ কই? তুমি না এই বছর আমারে জিএফ দিবা?” আমি বোকা পুরে জিগাইলাম। তাহিয়া পু –“আহেম!” আর কিছু বলে না। তাই সবার সাথে কুশল বিনিময় করলাম। তারপর জিজ্ঞেস করলাম –“ আচ্ছা, আমাদের কবি কই...... আর সায়িম ভাই কই গেলো?” –“পাতা খাইতে!” উত্তর দিলো বিশিষ্ট গিট্টুবাজ তুষার ভাই। ইকু ভাই -“আরে ওইতো ওরা।” দেখলাম গেট দিয়ে ঢুকছে দুই কবি উইথ পাতা। যাই হোক সবাইকে নিয়ে মেলায় ঢুকলাম। তারপর ওদের সাথে চা খেলাম। মুন পু ওর বিয়ের কার্ড দিলো সবাইকে।
আমাকে একটা গিটার জোগাড় করে দেয়া হল। তখন সবাই মিলে আড্ডা দিতে দিতে গান গেলাম......... এই কণ্ঠ যতদিন... গেয়ে যাব গান ততদিন ......তুমি আছ হৃদয়ের আয়নায়!!
ছবি তুলতে লাগলাম। ওরে পোজ একেক জনের। দেখে মনে হইলো সবাই সেলিব্রেটি হয়ে গেছে। তারপর গ্রুপের ভবিষ্যৎ আলোচনা করতে থাকলাম।
তারপর আমি কাউকে না জানিয়ে ডুব মারলাম। অনেক কিছুই দেখলাম জীবনে। এখন ওদের থেকে দূরে থাকতে চাই। আইডি ডিএক্টিভেট করে দিলাম। পুরাপুরি ডুব যাকে বলে আরকি। হিমুনীতি জাগলো মে বি। যাই হোক, কিছুদিন পর সকালে আমার জানের দোস্ত ইরাম কল দিলো। রিসিভ করতেই বাজখাই গলায় ঝাড়ি মারলো –“ওই হারামজাদা, কই তুই?” আমি –“জাহান্নামের চৌরাস্তায়।” –“অ আচ্ছা, এখন মাটিতে নাইমা আয়।” –“আইলাম, কি হইছে?” –“মুক্তিযোদ্ধা পার্কে আয় আধা ঘণ্টার মধ্যে।” –“ক্যা?” –“তোর বিয়া দিমু। আয়।” বিয়ের কথা শুইনা না নাচতে নাচতে গেলাম পার্কে। দেখি বেটায় দাড়িয়ে আছে। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম -“কিরে?” –“পিছে ফের হতভাগা!” ঘুরে দাড়াতেই ঠাস করে একটা থাপ্পড় খেলাম। তারপর আরও দুইটা। দেখলাম আমার ফেসবুক ফ্যামিলি সগর্বে বরিশালের বুকে দাঁড়িয়ে আছে। সাথে আছে আমার আরেক বন্ধু আনিকা। থাপ্পড় টা দিছে মেমি, মুন পু আর আংকা (আনিকা)...... (পরে জেনেছিলাম ওরা ইরাম আর আনিকার সাথে যোগাযোগ করে আমার উপরে চড়াও হইছে।) –“থাবড়ায়ে তোর ভেগাবন্ডগিরি ছুটাবো...” মুন পু কহিল। আমি কাঁদো কাঁদো স্বরে শুধাইলাম –“মেয়েরা এত নিষ্ঠুর হয় ক্যান?” জগতের নির্মমতায় দেখিলাম তাহারা চোখ দিয়ে রাগ বর্ষণ করিতেছে আর বাকিরা সহানুভূতির চোখে তাকিয়ে আছে। কি আর করা, আমার সেই জগত ভুলানো হাসিটা দেয়ার চেষ্টা করলাম.........
হয়তো এটা কোনো স্বপ্ন অথবা মনের কোনো অজানা ইচ্ছা। যাই হোক, আমি স্বপ্ন দেখতে ভালবাসি। আশা করি এই হতভাগ্যের স্বপ্নটা যেন সত্যি হয়।