
Story
শেষ ট্রেনের যাত্রী
১.
ম্যাডামের সাথে আমার প্রথম দেখা হয় স্কুলে থাকতে। তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি। বয়স তখন কম হলেও পাকতে শুরু করেছিলাম সবাই। আমি হয়তো একটু বেশিই। ক্লাস সিক্সের কৃষি ক্লাসটা নিয়মিত করতাম আর অন্য কোনো ক্লাস না করলেও। কারণ সেই ম্যাডাম। হয়তো আমার জীবনের প্রথম প্রেমের দোলা লাগে সেই ম্যাডামকে দেখেই।
সামিরা রহমান। নামটা একটু অদ্ভুত। সেই সময় সারাদিন খুঁজেও নামের অর্থ বের করতে পারিনি। কাউকে জিজ্ঞেসও করিনি এই ভয়ে যে কিশোর মনের সেই গোপন অভিসার কেউ ধরে ফেলবে। বন্ধুদের তো লজ্জায় বলতে পারিনি। মানুষ নিজের সমান অথবা ছোট কারো প্রেমে পড়ে, আমি না হয় ম্যাডামের প্রেমেই পড়লাম। সমস্যা কি?
আগে কৃষি খুব বোরিং লাগতো আমার কাছে। সেদিন একটা ক্লাস শেষ করে বসে আছি। দেখলাম আমাদের এক স্যার আসতেছেন, পিছনে কে যেন। বাঁদরামো বন্ধ করে এক দৌড়ে সিটে গিয়ে বসলাম। স্যারের সাথে সাথে ম্যাডাম ভিতরে ঢুকলেন আর আমি প্রথম দেখাতেই তার প্রেমে পড়ে গেলাম। অন্যদের প্রেমে পড়লে কেমন লাগে জানি না তবে আমার যে শ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিলো এটা মনে আছে। ম্যাডাম ক্লাসে এসে কিছু না বলে সবার প্রথমে যে ছোট্ট মিষ্টি হাসিটা দিয়েছিলেন তা আজও আমার কাছে নতুন।
সামিরা ম্যাডাম যখন আমাদের স্কুলে প্রথম আসেন তখন তার বয়স বেশি ছিল না। সদ্য পাস করে বের হওয়া এক তরুণী। রূপের বর্ণণায় যাব না তবে এটা বলতে পারি ম্যাডাম ছিল আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দরী নারী। তাকে দেখলে যেন বুকের ভিতরে অজান্তে হাজার বার বজ্রপাত হয়।
আমার সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য ছিল আমি ছিলাম ম্যাডামের বেষ্ট বয়। সেই প্রথম দিন থেকেই আমি তার কাছে যোগ্য পাত্র হয়ে ওঠার চেষ্টা করতে থাকি।
একদিনের ঘটনা। বৃষ্টির দিন ছিল। আমরা মাত্র অল্প কয়েকজন গিয়েছিলাম স্কুলে। সেদিন কৃষি ক্লাস ছিল না। তো ছাত্র কম হওয়ার দরুন আমরা স্কুল দলগত ভাবে পালানোর প্ল্যান করি। কিন্তু সবাই আমাকে পিছনে রেখে ঝেড়ে দৌঁড় দেয় আর আমি পড়বি তো পড় মালির ঘাড়ে মানে সামিরা ম্যাডামের ঘাড়ে গিয়ে পড়লাম। ম্যাডাম আমার ঐ অবস্থা দেখে জিজ্ঞেস চোখ পাকালো। আমার তো হাত-পা কাঁপাকাপি শুরু হয়ে গিয়েছে।
আমাকে ডাক দিলেন ম্যাডাম। আমি মুখ কাচুমাচু করে তার সামনে গেলাম। জিজ্ঞেস করলেন
-ক্লাস টাইমে কই যাওয়া হচ্ছে?
-ইয়ে মানে এই তো বাথরুমে।
-ব্যাগ নিয়ে বাথরুমে?
উনি হাসিমুখে রাগত কন্ঠে প্রশ্ন করলেন।
-না মানে ঐতো ইয়ে কেউ নেই ক্লাসে। আমি একা। তাই ভাবলাম বাসায় চলে যাই।
-একা থাকলে কি হয়েছে? প্রত্যেকটা ক্লাস করবে।
-জ্বী আচ্ছা।
-আচ্ছা এখন যাও।
আমি একরকম পালিয়ে বাঁচি টাইপের তাড়াহুড়ায় ক্লাসে ফেরত যেতে শুরু করলাম। কিন্তু পিছন থেকে ডাক এলো। উনিও আমার সাথে এসে ক্লাসে বসলেন। হঠাৎ কোনো আগাম সংকেত না দিয়ে তীব্র বৃষ্টি শুরু হলো। সামিরা ম্যাডাম বৃষ্টি দেখতে দেখতে আমাকে কাছে ডাকলেন। আমি কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই উনি আমার গাল টিপে দিয়ে ব্যাগ থেকে চকলেট বের করে দিলেন।
আমি নিরবতার হাসি উপহার দিলাম তাকে। উনি সন্তুষ্ট হলেন। তারপর উনি ক্লাসের বাকি সময়টা আমার সাথে গল্প করে কাটিয়ে দিলেন। সে গল্প অন্য কারো পছন্দ নাও হতে পারে কিন্তু আমার কাছে তা ছিল কিশোর বয়সের অপার এক রহস্য। তখন মনে মনে ভাবতাম ম্যাডাম আমাকে বুঝি পছন্দ করতেন। কিন্তু আজ জানি তিনি আমাদের সাথে তার জীবনটা ভাগ করে নিতে এসেছিলেন শিক্ষকের রূপে। মা-বাবা হারা সন্তান মামার পরিবারে যে ব্যবহার পেয়েছিলেন তার চেয়ে আমাদের কাছে তার সময় অনেক ভালো কাটতো। আমিও মনে মনে ভুল ভেবেও সঠিক ব্যাপারটা অনুভব করতে পেরেছিলাম।
২.
স্কুলের পাট চুকিয়েছি কয়দিন আগে। এখন নিজেকে কলেজের ছাত্র ভাবার মজাই আলাদা। ভর্তি হলাম আমাদের জেলার স্বনামধন্য একটি কলেজে। শিক্ষাজীবনে আলোর মুখ খুব একটা দেখিনি। কিন্তু কলেজে ওঠার পর আমার ভাগ্যের খেলার শুরুটা ভালোই ছিল। কলেজের ওরিয়েন্টাল ক্লাসে গেলাম। একএক জন স্যার ম্যাডাম আসতে লাগলেন আর একই কথার পুনরাবৃত্তি শুনে বাইরে যাওয়ার উদ্যেগ নিলাম। কিন্তু আমার আর বাইরে যাওয়া হলো না, আমি বজ্রাহত হয়ে গেলাম। কারন দরজা দিয়ে প্রবেশ করলেন আমার বহু আকাঙ্ক্ষার মানবী সামিরা রহমান।
তাকে দেখে আমার মাত্র একটি কথাই মনে হয়েছিলো। একবার তাকে হারিয়েছিলাম। কিন্তু দ্বিতীয়বার তাকে আর হারাতে দেবো না।
ক্লাস সিক্সে থাকা অবস্থাতেই ম্যাডাম তার ট্রেনিং এর জন্য চলে যান। পরে আর আসেননি। অনেক অপেক্ষা করেছিলাম তার জন্য। কিন্তু একসময় হতাশ হয়ে তাকে দেখার আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু আজ আমার ভাগ্য ইউ টার্ন নিল।
কলেজের তৃতীয় দিন। আসতে একটু দেরী হয়ে গিয়েছিল। তাই একাই কলেজে ঢুকতে যাচ্ছিলাম। পাশ থেকে এক বড় ভাই ডাক দিলো
-ঐ ছেলে, এদিকে আয়।
-জ্বী ভাইয়া, কিছু বলবেন?
-নাম কি?
-লিও।
-কোন ইয়ার?
এখন তার পাশে আরো কয়েকজন গুন্ডামার্কা ছেলে এসে দাঁড়ালো।
-ইন্টার ফার্স্ট ইয়ার।
-ও আচ্ছা। তা ২৫ ঘরের নামতা বল।
-কেন ভাইয়া?
-তোরে বলতে বলছি বল।
কথা বলতে বলতে সবাই আমাকে ঘিরে ধরলো। সবার মুখে এক ধরনের কৌতুক খেলা করছে।
-পারি না।
-পারিস না কেন?
-জানি না ভাইয়া। আমার ক্লাস আছে। যেতে হবে।
-আরে যাবি আনে। একটু দাঁড়া। সিগারেট খাস?
আরেকজন ছেলে বলল।
-নাহ।
-এইটা ধর। জোরে একটা টান দে।
-পারবো না। আমাকে যেতে দেন প্লিজ।
মাথা নিচু করে বললাম।
-কি বললি! তোর এতো সাহস। প্যান্ট খোল।
-ভাই আমাকে যেতে দেন প্লিজ।
একজনে এসে একটা থাপ্পড় মারলো। যত না ব্যথা লাগলো তার চেয়ে অপমানে কান গরম হয়ে গেল আমার।
পাশে দেখলাম আমাদের কয়েকজন ক্লাসমেট দাঁড়িয়ে মজা দেখতেছে। কেউ সাহায্য করতে এগিয়ে আসলো না।
-ছেড়ে দে রিমন।
নেতা গোছের ছেলেটা বলল।
-আচ্ছা ভাই। ঐ শোন কালকে ২৫ ঘরের নামতা মুখস্থ করে আসবি।
আমি নিচু মাথায় সায় দিলাম।
-এখন যা।
ক্লাসে না গিয়ে সোজা কলেজ থেকে বের হয়ে গেলাম।
৩.
পরেরদিন আমার বন্ধুরা ফোন করে অতিষ্ট করে তুললো। তারা অন্যের মুখে ঘটনাটা জানতে পেরেছে। আমি আর কিছু বলিনি। নিজের অবস্থা বিবেচনা করে বাস্তবতাকে মেনে নেয়ার চেষ্টা করেছিলাম।
কিছুদিন পরে কলেজে যাই ও যথারীতি স্বাভাবিক জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। শুধু একটি বিষয় বাদে। সামিরা ম্যাডামের প্রতি দিন দিন দূর্বল হয়ে যাচ্ছিলাম। উনি কেমিস্ট্রির প্রভাষক। তার বাসায় গিয়ে পড়া শুরু করলাম। মন দিয়ে পড়াশোনা করার চেষ্টা করতে লাগলাম তার কাছে নিজেকে কিছু একটা প্রমাণ করার জন্য। একটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছি। ম্যাডাম আমাকে চিনতে পারেননি। তাই আমার জীবনের মন-রসায়নে সালফিউরিক এসিডের আরো এক প্রলেপ পড়লো।
প্রতিদিন কলেজে যেতাম ম্যাডামকে এক নজর দেখার জন্য। তার ক্লাসের সবচেয়ে মনোযোগী ছাত্র বোধহয় আমার চেয়ে আর কেউ ছিলো না। কারণে অকারণে সামিরা ম্যাডামকে অনেক কল করতাম তার কন্ঠ একবার শোনার জন্য। কিন্তু আমার চেয়ে প্রায় ১০ বছরের বড় তরুণি তা বুঝতে পারতো না।
ফার্স্ট ইয়ার মিডটার্ম পরীক্ষার পর। বন্ধুরা মিলে আড্ডা দিচ্ছি। মেয়েদের মধ্যে আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু দিপা আমাকে ডাক দিল। আমি আড্ডা ছেড়ে ওর কাছে গেলাম।
-লিও। তোকে কিছু কথা বলবো। ভালো করে শোন।
-আচ্ছা বল।
-দেখ কথাটা অনেকে অনেকভাবে বলে। কিন্তু আমি সরাসরি বলবো তোকে।
-আচ্ছা বল।
আমি হাসিমুখে বললাম।
-আমি না তোকে ভালোবাসি।
-আমিনা টা কে?
-দেখ! ফাজলামি করবি না। আমি সিরিয়াসলি বলছি।
দিপার চোখে আগুন দেখতে পেলাম।
-কিন্তু এটা সম্ভব না দিপা।
-কেন?
-আমি মুসলমান যা।
-তাতে কি হয়েছে? ভালোবাসা ধর্ম মানে না।
-কিন্তু তার পরেও সম্ভব না।
দিপা কেঁদে ফেলল। আশপাশের অনেকেই তাকিয়ে আছে। আমি তাড়াতাড়ি ওর হাত ধরে এক পাশে নিয়ে গেলাম।
-দিপা, এতোদিন তোদের কাউকেই বলিনি। কিন্তু আজ শোন, আমিও একজনকে ভালোবাসি।
দিপা লাল চোখ দিয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো
-কে সে?
-সামিরা ম্যাডাম!
-কি বললি! এটা কিভাবে সম্ভব? উনি তো আমাদের ম্যাডাম।
-ভালোবাসায় ধর্ম না মানলে বয়স মানে কি করে?
-কিন্তু কিন্তু…
-কোনো কিন্তু নেই দিপা। পারলে মাফ করে দিস।
বলেই চলে এলাম। নিজেকে খুব খারাপ মনে হচ্ছে। কিন্তু কিছু করার নেই। এই মেয়েকে এভাবে না বললে সে শুনবে না কিছুতেই।
৪.
দুইদিন পর। আজ ১৪ ফেব্রুয়ারী, ভালোবাসা দিবস। আজ আমার না বলা কথা ম্যাডামকে বলবো বলে গতো একমাস ধরে প্ল্যান করছি। তাই পকেটে একটা লাল গোলাপ নিয়ে ম্যাডামের বাসায় পড়তে গেলাম। দেখা গেল, আমি শুধু একাই পড়তে গিয়েছি। বাকিরা সবাই পার্কে। এতে আমার সুবিধাই হলো। নিজেকে মনে মনে প্রস্তুত করে নিলাম। ম্যাডাম তার মামার পরিবারের সাথে থাকেন। আর বাসার গ্যারেজ কাম সাইড একটা রুমে পড়ান। সেখানে কিছক্ষণ একা বসে থাকার পরেই তার প্রবেশ ঘটল।
সামিরা ম্যাডাম একটা নীল রঙের শাড়ি পড়েছেন। আমি প্রতিবারের মতো আজও তার প্রেমের সাগরে ডুব দিলাম। কোনো মতে তোতলাতে তোতলাতে বললাম
-হ্যাপি ভ্যালেন্টাইনস ডে, মিস।
-আহা! তোমাকেও ভ্যালেন্টাইনস ডে এর শুভেচ্ছা।
-ইয়ে মিস, এটা আপনার জন্য।
কি বলে দেবো বলে ভেবে রেখেছিলাম আর কি বলে গোলাপটা দিয়ে দিলাম।
-সুন্দর। ধন্যবাদ। কিন্তু আমাকে কেন?
-ইয়ে মানে আসলে কেউ নেই তো!
লাজ শরমের মাথা খেয়ে বললাম।
এদিকে ম্যাডাম দেখি মিটিমিটি হাসছে।
যা হবার হয়ে গেছে। এবার অন্তিম কথাটা বলে দেই।
-মিস, আমি আপনাকে ভালোবাসি। আপনি কি আমাকে বিয়ে করবেন?
বলেই ঝেড়ে এক দৌড় দিলাম। এক ছুটে রাস্তায় নেমে হাঁপাতে লাগলাম। ম্যাডাম কি বলে বা তার মুখের অভিব্যক্তি কেমন ছিল তা বোঝার সময় দিলাম না নিজেকে। এখন কেমন যেন লাগছে। একইসাথে ভারমুক্ত আর অনুশোচনা। কি করা যায় ভাবতে লাগলাম ম্যাডামদের রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে।
৫.
পরেরদিন ম্যাডাম আমাকে ফোন করে তার সাথে দেখা করতে বললো। গলার স্বরে তার মানসিক অবস্থা বুঝতে পারলাম না। আমাকে পার্কে যেতে বলেছিলেন বিকেলে। গেলাম। নির্দিষ্ট জায়গায় বসে আছি। টেনশনে ঘাম ঝড়ছে প্রচুর।
হঠাৎ কোথা থেকে দিপা এসে দাঁড়ালো। জিজ্ঞেস করলো এসময়ে এখানে কি করছি। মেয়েটি আর আগের মতো নেই। আমিও তাই সাবধানে উত্তর দিলাম। ও একটু পরেই চলে গেল আর আমিও হাফ ছাড়লাম। কারণ ম্যাডামকে দেখলে ও কজি কান্ড করে বসে কে জানে।
পিছন থেকে কেউ কাঁধে হাত রাখলো। আমি লাফিয়ে উঠলাম। দেখি সামিরা ম্যাডাম হাসছে তার অপরিচিত এক হাসি দিয়ে। আমি থতমত খেয়ে বোকার মত দাঁড়িয়ে থাকলাম। কোনো সম্ভাষণও করিনি।
ম্যাডাম চোখমুখ শক্ত করে বসতে বললেন। আমার পাশে এসে বসলেন নিজে। বললেন
-তুমি আমার ছাত্র হয়ে একথা কিভাবে বললে কালকে?
চুপ করে থাকলাম।
-কি হয়েছে? উত্তর দাও।
-ইয়ে মানে ম্যাডাম…ইয়ে … আমি আপনাকে খুবই পছন্দ করি তাই।
-তাই বলে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দেবে?
-আপনাকে আমি সারাজীবনের জন্য নিজের কাছে চাই। ক্ষণিকের জন্য না।
আবারো লজ্জার মাথা খাওয়া শুরু করলাম। দেখলাম ম্যাডামের গাল হালকা লাল হয়ে গেছে।
-তুমি সত্যিই আমাকে ভালোবাসো?
-জ্বী ম্যাডাম!
-ভালোবাসো আবার ম্যাডামও বলো! আজব ছেলে তো।
কিছু বললাম না। একটা কনফিউজ করা হাসি দিলাম। উনিও হাসলেন। তারপর হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলেন।
-দেখো লিও… আমিও তোমাকে পছন্দ করি। কিন্তু আমার পক্ষে এটা সম্ভব না।
-কেন ম্যাডাম? আমি বয়সে ছোট বলে?
-আমমম… নাহ। আমার মতে ভালোবাসায় বয়স বা জাতি ফ্যাক্টর না। আমার অন্য সমস্যা আছে।
-কি সমস্যা?
তারপর ম্যাডাম তার সমস্যার কথা বললেন। যা ছিল আমাদের কলেজের এক নেতাকে নিয়ে। সে নাকি ম্যাডামকে প্রোপোজ করেছিল। ম্যাডাম মানা করার পরেও সে নাকি ম্যাডামকে জ্বালাতন করে। কলেজে গেলে বিরক্ত করে। ইদানিং নাকি তার অত্যাচার আরো বেড়েছে। ম্যাডাম বাসায়ও বলতে পারেন না তার সমস্যার কথা, কারণ তাতে তার শিক্ষক হবার স্বপ্ন নষ্ট হয়ে যাবে। আর এখন সে প্ল্যান করতেছে ম্যাডাম যতদিন রাজী না হবেন ততদিন তাকে একঘরে করে রাখবেন।
-এখন তুমি সাবধানে থেকো। আর এই মাসে আর পড়তে এসো না।
-কিন্তু ম্যাডাম!
-কোনো কিন্তু না। যা বলেছি তাই। আশা রেখো… যেকোনো সময় যেকোনো কিছুই হতে পারে। চাইলেই হয়, চাইতে হয়।
আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে উনি চলে গেলেন। পিছনে রেখে গেছেন এক দূর্ভেদ্য রহস্য। আমি রহস্যের জট ছাড়াতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু কিছু বোঝার আগেই মাতাহ্র পিছনে তীব্র এক ব্যাথা আর আমার জগৎ অন্ধকার হয়ে গেল।
৬.
আলোর একটা সুক্ষ্ম রেখা আসতে আসতে বড় হতে হতে আমার চেতনায় লাগলো। অতঃপর মহাবিশ্ব সৃষ্টির থেকে বর্তমান পর্যন্ত সব কিছু যেন এক লহমায় আমার স্মৃতিতে আঘাত হানলো। আমিও চোখ খুলে তাকালাম। হাত নাড়াতে চেষ্টা করলাম। পারলাম না। মনে হলো আমার হাত বলে কিছুই নেই। চিৎকার দিয়ে উঠলাম। চোখের কোনে কিছু নড়াচড়া দেখলাম। পরে আসতে আসতে সব বুঝতে পারলাম। আমি একটি হাসপাতালে রয়েছি।
আমার কাহিনী দিপার মুখেই শুনলাম। সেদিন ম্যাডামের সাথে দেখা হওয়ার আগে আমার দিপার সাথে দেখা হয়। দিপা আমাকে দূর থেকে দেখতে থাকে। ম্যাডাম চলে যাওয়ায় পর সেই নেতা, নিজাম তার দল নিয়ে এসে আমাকে পিছন থেকে এ্যাটাক করে। মাথায় আগে মারার ফলে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। তারা হকিস্টিক দিয়ে আমাকে পিটাতে থাকে। দিপা দূর থেকে দৌঁড়ে এসে লোকজন ডেকে আমাকে মেরে ফেলা থেকে বাঁচায়। ও-ই আমাকে হাসপাতালে নিয়ে আসে। আমার একটা হাত ও মেরুদন্ডের কয়েকটা কশেরুকা ভেঙ্গে গেছে। পরে বাবা মার কাছে শুনলাম দিপা-ই নাকি আমার সেবা করেছে এই কয়দিন।
-ম্যাডাম কেমন আছে?
আমি দিপাকে প্রশ্ন করলাম। আমার অকৃতজ্ঞতার এই নমুনা দেখে দিপা মনে আঘাত পেল খুব। তবুও বাইরে প্রকাশ করলো না। জানালো ম্যাডাম ভালোই আছে। তবে আগামী সপ্তাহে নাকি ম্যাডামের বিয়ে… নিজামের সাথে।
অনুভূতি শূন্য হয়ে পড়লাম খানিকের জন্য। কিন্তু একটা কথা মনে পড়লো আমার। চাইলেই হয়, চাইতে হয়।
মোবাইল অন করতেই অনেকগুলো টেক্সট ম্যাসেজ পেলাম। কিছু বন্ধু বান্ধবের। আর অধিকাংশই সামিরার। তার শেষ ম্যাসেজ ছিলো…
“আজ এই অসময়ে বুঝতে পারছি আমার জীবনেও ভালোবাসা এসেছিল, এক ছাত্রের কাছ থেকে। কিন্তু এখন অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে। ভালো থেকো লিও।”
নাম্বারে কল করলাম সাথে সাথে। কিন্তু সুইসড অফ। আমি কাতর চোখে দিপার দিকে তাকালাম। দিপা জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে অশ্রুচোখে।
৭.
দুইদিনের চেষ্টায় আমি সোজা হয়ে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছি। এখন একটা কাজ করা বাকি। দিপার সাহায্য লাগবে।
প্ল্যানের প্রথম অংশটা খুব ভালোভাবেই শেষ হল। আমি এখন সামিরা ম্যাডামের রুমে। আজ ম্যাডাম আর নিজামের বিয়ে। ম্যাডামকে বৌয়ের সাজে অসাধারণ লাগছে। কিন্তু কাজ সারতে হবে দ্রুত। কারন ম্যাডামের সাথের মেয়েরা বরপক্ষকে রিসিভ করতে গিয়েছে। আমি আর সামিরা ম্যাডামের রুমে ঢুকেছি বোরকা পড়ে অনেকের চোখকে ফাঁকি দিয়ে। কিভাবে করলাম নিজেরই বিশ্বাস হয় না। তাড়াতাড়ি ম্যাডামকে আমার বোরকাটা পড়িয়ে দিলাম। আর দিপাকে পাঠালাম নিজামকে ডেকে আনতে। নিজামকে ডেকে এসেই দিপা ম্যাডামকে বোরকা পরা অবস্থায় সাথে নিয়ে বের হয়ে যায়। আমি রুমে অপেক্ষা করি। একটা কাজ সারা বাকি আছে।
নীল রঙের পাঞ্জাবী পড়া অবস্থায় নিজাম দরজা খুলে ম্যাডামের রুমে ঢোকে। আমি দরজার পাশেই দেয়াল ঘেসে দাঁড়িয়ে ছিলাম। নিজাম ম্যাডামকে খুঁজতে শুরু করার সাথে সাথেই আমি ডান হাতের সর্বশক্তি দিয়ে হাতে ধরা ফুলদানিটা নিজামের মাথায় ভাংলাম। সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছে না মরে গেছে বুঝলাম না। কিন্তু আমি কোনো রিস্ক নিলাম না। বেল্ট থেকে সুইস নাইফটা বের করে নিজামের চোখদুইটা গেলে দিলাম। দেহটা ঝটকা মেরে উঠলো আর মেঝেতে রক্তের বন্যা বইতে লাগলো। কিন্তু তাতেও আমি থামলাম না… নাইফটা দিয়ে নিজাম নামের কুকুরটার ডানহাতের উপর অনেকগুলো কোপ বসালাম। আমার মাথায় তখন শুধু একটা কথাই ঘুড়ছিলো… “এভরিথিং ইজ ফেয়ার ইন লাভ অ্যান্ড ওয়ার।”
রুমের বাইরে দুই চ্যালা দাঁড়িয়ে ছিল। আমি ওদের কিছু বলার বা করার সুযোগ না দিয়ে সাইলেন্সর লাগানো পিস্তল বের করে দুইটারই পায়ের উপর এক ম্যাগাজিন বুলেট খালি করলাম। আশপাশের মানুষজন তা দেখে বিশেষ করে মেয়েরা চিৎকার দিয়ে ওঠে। সাথে সাথে বিয়ে বাড়িতে তুলকালাম কান্ড বেঁধে যায়। আমিও তাড়াতাড়ি পিস্তল পকেটে ভরে গন্ডোগোলের সুযোগ নিয়ে বাইরে বের হয়ে আসি আর গাড়িতে উঠে পালাই। কিছুদূর গিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়ি। তার আগে অবশ্য হাতের গ্লাভস, চোখের চশমা আর উইগটা খুলে ফেলি। এখন গন্তব্য ট্রেন স্টেশন।
রাত ১০ টা। দিপা আর সামিরা ম্যাডাম রাতের শেষ ট্রেনে বসে আছে। ম্যাডামের চোখে একই সাথে ভালোবাসা ও বিস্ময়ের দৃষ্টি। তারা দুইজনেই বুঝতে পারছে না কি হচ্ছে বা আমি কি করতে চাচ্ছি। সামিরা যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না যে সে সাক্ষাত জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে এসেছে। দিপাও আমার সাথে আমাদের নতুন জীবনে যোগ দিতে যাচ্ছে। ট্রেন ছাড়ার আগ মূহুর্তে আমি ট্রেনে এসে উঠলাম, পিছনে ছেড়ে এসেছি এক নষ্ট অতীত। নিয়তির সুতায় আমরা তিনজন আটকা পড়ে গিয়েছি। দেখা যাক জীবনটা কোথায় দাঁড়ায়।
আর এভাবেই হয়তো রাতের শেষ ট্রেনের যাত্রিদের মধ্যে বিষমবাহু এক ত্রিভুজ প্রেমের সূচনা ঘটতে চলেছে।
সমাপ্ত।