প্রজেক্ট - 009
১.
আমি খুব মনোযোগ সহকারে ল্যাপটপের উপরে ঝুঁকে আমার কাজ করেতেছিলাম। কাজ বলতে আমার অবসর সময়ের কাজকেই বুঝিয়েছি। সেটা আর কিছুই না... বিভিন্ন ধরণের ওয়েবসাইট হ্যাক করা। আমি প্রফেশনাল হ্যাকার নই। কিন্তু আমি জানি হ্যাকিংয়ের খেত্রে আমার দক্ষতা ও জ্ঞান আমার সিটির মধ্যে কারও নেই। আমি চশমার গ্লাসটা মুছে চোখে দিয়ে জানালার বাইরে তাকালাম। বোস্টনের রাস্তার উপর তখন গুড়িগুড়ি তুষার পড়ছে। তুষার দেখে আমার দেশের বৃষ্টির কথা মনে পড়লো। কতোদিন দেশে যাওয়া হয় না। ঠিক করলাম এবার দেশে গেলে জবর বৃষ্টিতে ভিজবো। আসলে হায়ার এডুকেশনের জন্য আমার বাবা মা আমাকে বোস্টনে পাঠিয়ে দেয়। আপাতত একটা ফ্লাট শেয়ার করে থাকি এখানে একটা ইউরোপিয়ান ছেলের সাথে।
ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই আমি খানিকটা অবাক হয়ে গেলাম। দেখলাম সেখানে নতুন ধরনের কিছু জিনিস আছে। আমি আজকে প্রথম দিকে উদ্দেশ্যহীনভাবে ওয়েব ব্রাউজিং করতেছিলাম। নিজের ফেইক কিছু মেইল আইডি আর ওয়েবে গুতাগুতি করতে গিয়ে একটা খুব অদ্ভুত আর ছোট একটা লিঙ্ক পেলাম। কপি করে রেখেই যেই লিঙ্কটার উপর ক্লিক করলাম অমনি কিছু হিজিবিজি লেখা এসে আমার আইডিটা পুরা লোপাট করে দিলো। আমি খানিকটা বিস্মিত হয়ে চিন্তা করতেই বুঝতে পারলাম এর ভিতরে বড় কোনো ঘাপলা আছে। সহজে এটাকে ভাংগা বা ক্রাক করা যাবে না। এর জন্য দরকার হবে আরেকটা নতুন ওয়েবসাইট তৈরি করা লাগবে আমার যার জন্য প্রয়োজন অনেক বড় হার্ডডিস্ক। তাই আমি সেটা কালকে কিনবো চিন্তা করে আজকের মতো কাজ বন্ধ করে ঘুমাতে গেলাম। কিন্তু আমার মনের মধ্যে খচখচ করতে লাগলো। কি যেন একটা ঠিক নেই!
পরদিন সকালে আমি আমি ক্লাসে গেলাম। বোরিং ক্লাসে আমার মন বসতেছিলো না। কারণ আমার মনে তখন অন্য কিছু চলছিলো। হঠাৎ পিছন থেকে কে যেন খোচা মারলো। পিছনে ফিরতেই দেখি আনিকা। আনিকা আমার খুব ভালো একটা বন্ধু। আসলে নিজের দেশের মানুষ ঐখানে একমাত্র ও-ই বাঙ্গালী যদিও ওর জন্ম হয়েছে ইউএসএ তে।
-হেই! কি খবর?
-ভালো .. তোমার কি হয়েছে আজকে? এতো উদাস কেন?
-নাহ। কিছু না এমনিই।
-আরেহ.. বলো না।
-ওইতো .. আমার একটা কাজ নিয়ে খানিকটা চিন্তিত।
-আবার! . আবার ঐগুলা শুরু করেছো! আর কি কোনও কাজ নেই তোমার।
-নাহ.. বলে একটা ভেংচি দিয়ে উঠে পরলাম।
আমার গন্তব্য তখন একটা বড় কম্পিউটার ওয়ার্কশপের দোকান।
-এই! কই যাও?
-এইতো একটু কাজ আছে।
দোকানে সামনে গিয়ে দাড়ালাম আমি। অনেক বড় আর পপুলার দোকান বোস্টনের। কম্পিউটারের যাবতীয় প্রায় সবকিছুই পাওয়া যায় এখানে।
সেলসগার্লের কাছে গিয়ে দাঁড়াতে সে বললো (ইংরেজীতে)
-এক্সকিউজ মি স্যার। আমি আপনাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি?
-ইয়ে মানে ... আমার ১ এক্সাবাইট মেমোরির একটা হার্ডডিস্ক লাগবে!
মেয়েটা খানিকটা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালো।
-স্যরি স্যার। আমাদের কাছে এতো বড় হার্ডডিস্ক নেই। আপনি চাইলে আমরা অর্ডার দিয়ে বানিয়ে দিতে পারবো।
-আচ্ছা ঠিক আছে।
এডভান্স পে করে জিজ্ঞেস করলাম
-কবে পাওয়া যাবে?
-কালকে সন্ধায়।
-ও আচ্ছা।
-থ্যাংক ইউ স্যার। আবার আসবেন।
দোকান থেকে বের হতেই মনে হলো কিছু কেউ আমার দিকে লক্ষ্য রাখছে গোপনে। কিন্তু ওইদিকে নজর না দিয়ে ঘরে ফিরে এলাম আমি।
পরশু দিন খুব সকাল সকাল ল্যাপটপ নিয়ে বসলাম। নতুন কেনা হার্ডডিস্ক টা লাগিয়ে নিলাম। কাজ শুরু করে দিলাম। প্রথমে নতুন আর উন্নত একটা ওয়েব ডিজাইনের ভয়েস কমান্ড দিলাম আমারই তৈরি করা অভূতপূর্ব একটা সফটওয়্যারে। এটায় শুধু কমান্ড দিলেই হয়। বাকি কাজ নিজে নিজে করে নেয়। আশা করি সন্ধার ভিতরে আমার নতুন ওয়েবসাইট তৈরি হয়ে যাবে।
বিকেলবেলা এসে দেখি কাজ শেষ। হার্ডডিস্ক প্রায় ভরে গেছে। রাতের খাবার শেষ করে বসলাম কাজে। নতুন মেইল আইডি খুললাম। তারপর কপি করা লিঙ্কে আমার নতুন ওয়েবসাইটের মাধ্যমে হ্যাক করে ঢুকলাম। তাতেই প্রায় ১:৩০ ঘন্টা লেগে গেলো।
আমি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। দেখলাম লিঙ্কটা আমাকে একটা ইন্টারন্যাশনাল মাফিয়া সংস্থার মাস্টার প্লানের মধ্যে নিয়ে ফেলেছে। সংস্থার নাম ব্লাক মাম্বা। যতো তারাতারি সম্ভব আমি সব ডাটা কপি করে নিলাম। কিন্তু বের হওয়ার আগে আমি একটা ভুল করে ফেললাম। আসলে ওটা একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে। ওরা আমাকে আর ট্র্যাক করতে পারবে না। কারণ ওদের এক সদস্যর পরিচয় নকল করে আমি ওদের প্লানে ঢুকেছিলাম। এতে ওই সদস্য পরে বিপদে পড়তে পারে। যাই হোক, পরে সব ট্র্যাকিং ডাটা ফরমেট করে ফেলি।
২.
পরেরদিন গতকালকের হ্যাক করা ডাটা নিয়ে গবেষণায় বসলাম। অনেক তথ্যই কোডিং করে রাখা। যার কারণে আমার পুরো অর্থ বের করতে অনেক সময় লাগছে। দুই-তিনদিন ধরেই ঘাটাঘাটি করছি আর তাদের প্ল্যান সম্পর্কে জেনে আমার গায়ের লোম প্রায় খাড়া হয়ে যাচ্ছে।
মাফিয়াদের মাস্টার প্ল্যানটা হচ্ছে পৃথিবীর বড় বড় ও উন্নত দেশগুলোর পতন ঘটিয়ে অনুন্নত দেশগুলোর হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে সারা পৃথিবীতে তাদের রাজত্ব কায়েম করা। কয়েক হাজার বিলিয়ন কোটি টাকার খেলা এটা। ব্যাটারা প্রায় প্রতিটা দেশে নিজেদের সংস্থা খুলেছে। এর পরিধি কল্পনা করলেও মাথা প্রায় খারাপ হয়ে যায়। বড় দেশগুলোর পতন ঘটাবে এরা দেশগুলোর আলাদা আলাদা সিটির আন্ডারস্ট্রিট ওয়াটার টানেলের সাথে টিএনটি বসিয়ে তা ব্লাস্ট করে! এটা দেখে আমার সারা শরীরের ভিতর দিয়ে একটা শিহরণ বয়ে গেল। তারা এই প্রজেক্টের নাম দিয়েছে “Project-009”। আরো কিছুটা দেখার পর একজায়গায় দেখলাম তাদের প্রথম আক্রমণ করার সম্পর্কে তথ্য দেয়া আছে। তারা প্রথমে আমেরিকাকে টার্গেট করেছে ধ্বংস করার জন্য। সেখানে একটা সিটির নামও দেয়া আছে বাইনারি কোডে। বাইনারিতে সেটাকে ভাঙ্গলে যে নামটা পাওয়া যায় তা হলো …… বোস্টন!
তথ্যটা পাওয়া মাত্রই আমি ভয়ানক চমকে উঠলাম। তথ্যটা সত্যি কি-না তা আমি জানি না। কিন্তু এটা জানি বোস্টন হয়তো বিপদের মুখে যা একমাত্র আমিই জানি। এখন কিছু করার আগে আমার নিজের আগে অনুসন্ধান করে দেখতে হবে। একটা ম্যাপও পেয়েছি ডাটাগুলোর মধ্যে। বোস্টনের আন্ডারস্ট্রিট ওয়াটার টানেলের মধ্যে টিএনটি বসানোর প্ল্যানের ম্যাপ ওটা। তাই ওইটা অনুযায়ী আমি জায়গাগুলো স্বচক্ষে দেখে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম।
প্রায় তিনদিন বাসার বাইরে বের হই না। তাই কোনোরকম আগাম খবর না দিয়ে হঠাৎ করে আনিকা আমার ফ্ল্যাটে চলে এলো। আমার বাসার অবস্থা তখন ভয়াবহ। পুরো এলোমেলো সবকিছু। তখন আমার রুমমেট ওর দেশে বেড়াতে গিয়েছে। তাই আনিকাকে বসতে দিয়ে আমি খানিকটা গুছিয়ে নিলাম। দেখলাম ও কেমন যেন উসখুস করতেছে। আমার কেন যেন মনে হল ওর সাথে কিছু আছে পকেটের ভিতর। তাই সেটাই হয়তো ওর অস্বস্তির কারণ। তাই আমিও আমার একটা কাজ করে নিলাম! টুকটাক কথা বার্তার পর ও আমাকে নিয়ে লাঞ্চ করতে বের হলো। বিকেলের দিকে যে যার ঘরে ফিরে গেলাম।
আমি নিজেকে আর সংযত রাখতে পারতেছি না। তাই চিন্তা করলাম আজকেই রাত্রবেলা বেরিয়ে পরবো। কারণ আমি জানি না যে কবে মাফিয়া টিম বোস্টন উড়িয়ে দেবে। কোনোমতে কিছু খেয়ে আমার ব্যাগপ্যাকটা গুছিয়ে নিয়ে বেড়িয়ে পরলাম আমি। ব্যাগপ্যাকের মধ্যে আছে কিছু স্যান্ডুইচ, পানি, টর্চ লাইট, আমার ল্যাপটপ, ক্যামেরা, মডেম, লাইটার, আর আমার নিজের তৈরি করা জিপিএস ট্রাকিং চিপ।
৩.
আমি আমার বাসার পরের ব্লকে গেলাম। ম্যাপে দেখলাম সেখান দিয়েই আমি নিচে যেতে পারবো। একটা ম্যানহোলের ঢাকনা খুলে আমি রড বেয়ে নিচে নেমে দাড়াতেই ভক করে একটা দুর্গন্ধ নাকে ধাক্কা মারল। আমি তাড়াতাড়ি নাকে রুমাল চাপা দিলাম। সেখানে দুই প্রান্তে সরু পথ রয়েছে আর মাঝখান দিয়ে শহরের ড্রেইনিং সিস্টেম। কিছু দূরে দূরে ছোট ছোট লাইট জ্বলছে। আমি টর্চ জ্বালিয়ে খানিক্ষন হাটলাম আর পকেটে হাত দিয়ে খানিকটা দূরে দূরে আমার তৈরি জিপিএস ট্রাকিং চিপ ফেলতে লাগলাম। কিছুটা পথ যেতেই দেখলাম দেয়ালের গায়ে কিছু গর্ত করা। আরো সামনে যেতেই দেখলাম একই রকম গর্তের মধ্যে কিছু লাগানো আছে আর তাতে নতুন প্লাস্টার করা হয়েছে। এবং সেগুলো সারি দিয়ে প্রায় ২০০ মিটার পরপর সাজানো। আমি পটাপট কয়েকটা ছবি তুলে নিলাম। আর আগাবো কি না চিন্তা করতেছি হাটতে হাটতে। হঠাৎ সামনে একটু আলোকময় জায়গা দেখতে পেলাম। তাই তাড়াতাড়ি লাইট বন্ধ করে দিলাম। এবার সামনে আগালাম ধীরে ধীরে সতর্ক ভঙ্গিতে।
-আরি সব্বোনাশ! আমার মুখ থেকে অস্পষ্টভাবে কথাটা বের হয়ে আসলো। সামনে সারি সারি টিএনটি ডিনামাইট রাখা আর প্লাস্টার করার যাবতীয় সরঞ্জাম রাখা। আশে পাশে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। তাই বিদ্যুৎবেগে কয়েকটা ছবি তুলে নিলাম। কিন্তু যেই আমি ক্যামেরাটা পকেটে রাখতে যাব অমনি আমার পিছনে পিস্তল লোড করার শব্দ শুনতে পেলাম।
-ক্যামেরাটা নিচে রেখে দুইহাত উপরে তুলে দাড়াও।
ভারী গলার কেউ একজন বললো আমাকে আমাকে। ঘাড়ে পিস্তলের খোচা খেয়ে যা বলেছে তাই করলাম। নিজেকে লাথি মারতে ইচ্ছা করছে। কারণ সাথে সেলফ ডিফেন্সের জন্য কোনো আর্মস নিয়ে আসিনি বলে। বোঝা উচিৎ ছিলো আমার। কিন্তু এখন কিছু করার নেই। ওই লোকটার সাথে আরেকজন এসে আমার ক্যামেরা থেকে মেমরী কার্ডটা খুলে নিলো আর আমাকে ও আমার ব্যাগপ্যাকটা সার্চ করলো। দুইজনেই অনেক শক্তি ধরে গায়ে বোঝা যাচ্ছে। কিছু না পেয়ে সামনে একজন গিয়ে তাকে অনুসরণ করতে ইঙ্গিত করলো আর পিছনের জন আমার ঘাড়ে পিস্তল ধরে রাখলো। তাদের উদ্দেশ্য ঠিক বুঝতে পারতেছি না। কিন্তু এটা ভালভাবেই বুঝতেছি যে উলটা পালটা কিছু করার চেষ্টা করলেই তারা আমার খবর করে ফেলবে।
লোকদুইটা আমাকে তারপর টানেল থেকে উঠিয়ে একটা গাড়িতে বসালো। তারপর আমার চোখ বেধে দিয়ে তীব্র গতিতে গাড়ি চালিয়ে একটা মাঝারি আকারের বাসার সামনে এসে থামলো। তারপর আমাকে বাড়ির ভিতরে নিয়ে গেলো। যতদূর মনে হচ্ছে বোস্টনে এটা ওদের হেডকোয়ার্টার। বাসাটার বেসমেন্টে নিয়ে আমাকে একটা চেয়ারে বেধে রাখলো আর আমার ব্যাগপ্যাকটাও ওখানে ফেলে দিয়ে তারা চলে গেলো।
যাই হোক, তারা তো আর জানে না আমি হুডিনির ফ্যান। তাহলে আর এরকম করে বাধতো না আমাকে। কারণ আমি হ্যারি হুডিনির একটা ট্রিক্স ব্যাবহার করেছি। আমার ভাগ্যটাও ভালো ছিলো। তাই হাতের পেশীগুলো শিথিল করতেই বাধন হালকা হয়ে গেলো। তারপর অনেক মোচড়ানোর পর অনেক কষ্টে হাতের বাধন পরে পায়ের বাধন খুললাম। হাত ডলতে ডলতে আমি পালানোর পথ খুজতে থাকলাম।
কিন্তু দরজা আর ভেন্টিলেশন পথ ছাড়া আর কিছু পেলাম না। তাই ব্যাগপ্যাকটা খুললাম। কিন্তু মোবাইল আর ল্যাপটপ হাতে নিয়েই বুঝলাম ব্যাটারা এগুলো কেন ফেলে গেছে। সারা বাড়িতে মে বি নেটওয়ার্ক আর রেডিও ওয়েভ প্রুফ করা হয়েছে। হতাশ হয়ে দরজার কাছে গেলাম। কিন্তু আজকে মনে হয় ভাগ্য আমার পক্ষেই। কারণ কি হোলে চোখ রাখতেই দেখতে পেলাম অপর পাশে চাবি লাগানো। তাই তাড়াতাড়ি স্যান্ডউইচের প্যাকেটটাকে চিরে দরজার নিচ দিয়ে ঐপাশে রাখলাম। তারপর মোবাইলের টাচ পেনটা দিয়ে কি হোলে সাবধানে গুতা দিতেই চাবিটা প্যাকেটের উপর পরলো। তারপর আমি দরজা খুলে চোরের মতো সিড়ি বেয়ে উপড়ে উঠে এলাম।
করিডরে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। তাড়াতাড়ি সদর দরজাটা খুজে কি হোলে চোখ রাখলাম। দেখলাম আমাকে যারা নিয়ে এসেছে তাদের একজন দাঁড়িয়ে আছে বাইরে। বাইরে যাওয়ার অন্য উপায় খুজলাম এবার। আর কোনো দরজা নেই। একটা জানালা পেলাম যেটা খোলা রয়েছে। যাই হোক, মাথা নিচু করে জানালাটার কাছে গিয়ে কপাটটা হালকা খুলে বাইরে উকি দিলাম। কাউকে দেখা যাচ্ছে না। এই জানালাটা দরজার খানিকটা দূরে। তাই হাতের উপর ভর দিয়ে আগে পা দুটো বাইরে বের করলাম। কিন্তু এবার আমার ভাগ্য বোধ হয় ইউ টার্ন নিলো। মাথার পিছনে আরও একবার পিস্তল লোড করার শব্দ শুনতে পেলাম।
আবার আগের মত চেয়ারে নিয়ে বাধলো। এবার খুব শক্ত করে। আর সামনে একজন ম্যাগনাম নিয়ে বসে রইলো। হঠাৎ একজন লোক এসে আমার সামনে বসে থাকা লোকটার কানে কানে কি যেন বললো। সে চলে যাওয়ার খানিকটা পরেই আমার সামনের লোকটা একটা সিগারেট ধরালো আর বললো
-মানুষের কাজে নাক গলানোর পরিণতি এবার হাড়ে হাড়ে টের পাবে। বলেই পিস্তল লোড করলো।
-কেন আমাকে মারতে চাও?
-কি করতে বাকি রেখেছো? আর একটু হলেই আমাদের প্ল্যান ক্রাশ করতো। সাথে আমাদের জানটাও যেত। মরার আগে কোনো শেষ ইচ্ছা?
আমি ভেবে দেখলাম বাচার আশা প্রায় নেই। তারপরও শেষ চেষ্টা করবো। তাই লোকটাকে খানিক্ষণ ব্যাস্ত রাখার চেষ্টা করবো।
-হুম। আমাকে বলতো তোমাদের উদ্দেশ্যটা কি?
-শুনবে! আচ্ছা বলছি।
বলেই লোকটা আমার আগে হতে জানা কথাগুলো বলে যাচ্ছে। আর এই ফাকে আমার মাথায় ঝড়ের বেগে চিন্তা চলছে। পরিবারের কথা মনে হল, আনিকার কথা মনে হল। আরেহ! আনিকার কথায় সেদিনের ঘটনাটা মনে পড়ে গেলো। ওকে উসখুস করতে দেখে ওর পকেট থেকে একটা কাগজ চুরি করি। ম্যাজিকে হাত হালকা পারদর্শী থাকায় কাজটা করতে তেমন বেগ পেতে হয় নি। সেখানে কিছু লেখা ছিলো। সেদিন বুঝতে পারিনি। কিন্তু এখন মৃত্যুর সামনে এসে আমার মাথা বিদ্যুৎ বেগে খেলতে লাগলো। আজ সেই সাংকেতিক লেখার মানে বুঝতে পারছি এখন। আনিকা সিআইএ এর এজেন্ট!
-ব্যাস। যথেষ্ট বলে ফেলেছি। এবার তোমাকে যেতে হবে। বলেই পিস্তলটা আমার মাথায় ধরলো লোকটা। আমি হতাশ হয়ে তারদিকে তাকিয়ে থাকলাম।
পৃথিবীতে মিরাকল বলে মনে হয় সত্যিই কিছু আছে। গুলি করার ঠিক আগ মুহুর্তে দরজাটা খুলে গেলো। আনিকাকে দেখা গেলো দরজায়। কালো রঙের বডি আর্মারের ড্রেস পড়া গায়ে। এক মুহুর্ত ও আমাদের দুইজনকে মেপে নিলো যেন। তারপর সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল তুলে গুলি করলো খুব দ্রুত। আমি বাতাসের মত ওর হাত দুইটা উপরে উঠতে দেখলাম শুধুমাত্র! আমার মাথায় পিস্তল ধরা লোকটার হাতে গুলি লাগলো। আর সে ককিয়ে উঠে হাত চেপে মাটিতে বসে পড়লো। কিন্তু অ্যাকশন তখনো শেষ হয়নি। লোকটা যেই উঠে দাড়াতে গেলো অম্নি আনিকা খাড়া দেয়ালে আড়াআড়িভাবে দৌড় দিলো প্রিন্স অফ পারসিয়ার গেমের মত। দৌড়েই দেয়ালে পা দিয়ে চাপ দিয়ে লাফিয়ে উঠে ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে লোকটাকে কিক মারলো। আমি বুঝতে পারলাম আমি এখন নিরাপদ। কারণ ততক্ষনে সিআইএ এর এজেন্টরা সারা বাড়ি কবজায় নিয়ে এসেছে।
আনিকা আমার হাত পায়ের বাধন খুলে দিতে লাগলো। আমি মুখটা হাসি হাসি করে বললাম
-আরেকটু দেরী করে এলেই তো ওরা আমাকে টপকে দিতো, এজেন্ট “এ টি” ! কিন্তু আমাকে খুজে পেলে কিভাবে?
-ও! জেনে গিয়েছো তাহলে! তোমার জুতায় জিপিএস ট্রাকিং চিপ লাগানো আছে। প্রথম থেকেই তোমার উপর নজর রাখার জন্য আমাকে পাঠানো হয়। কারণ এতো ইন্টেলিজেন্ট হ্যাকার আমাদের টিমে নেই।
-এতো কম বয়সী এজেন্ট যে!
-এটা আর কি। আমাদের টিমে ৮ বছরের বাচ্চারাও আছে!
-ওহ আচ্ছা। কিন্তু সিআইএ এর ট্র্যাকিং সিস্টেম এতো খারাপ কেন? আরেকটু হলেই তো গেছিলাম।
-আসলে হঠাৎ করে তোমার সিগন্যাল আমরা হাড়িয়ে ফেলি। তারপর একসময় আবার পাই আর সাথে সাথে অপারেশন শুরু করে দেই।
আমি বুঝতে পারলাম। এ বাড়িতে ঢোকার পর ওরা আমাকে হারিয়ে ফেলে। আর পা বাইবে বের করা মাত্রই আবার ট্র্যাক করতে পারে। আর ও ই আমাকে ফলো করতো রাস্তায়। আজ সব রহস্য পরিষ্কার হলো।
তারপর আমি ওর কাছে সমস্ত ডাটার হার্ডডিস্কটা ওর হাতে তুলে দিলাম। তারপর ব্যাগপ্যাকটা তুলে নিয়ে বাইরে যাওয়ার সময় ও পিছন থেকে দিলো।
-সিআইএ তে জয়েন করবে?
-চিন্তা করে দেখবো। বলে চোখ টিপে আমি বের হয়ে গেলাম।
রাত অনেক হয়েছে। আমি ঘুম ঘুম চোখে বোস্টনের রাস্তায় হাটছি আর অন্ধকারে একা একা হাসছি!
(২য় পর্ব)
১.
আমার সাথে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনার পরে কয়েকদিন কেটে গিয়েছে। আমিও আমার সেই আগের জীবনে ফিরে গিয়েছিলাম। কিন্তু নিজেকে আর আগের অবস্থায় ফিরে পাইনি। তাই বেশিদিন আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারলাম না। আনিকার দেয়া সেই প্রস্তাবটা মাথার ভিতর ঘুরপাক খাচ্ছে খালি। চিন্তা করে দেখলাম সিআইএ তে জয়েন করলে খারাপ হয় না। তাতে বরং আমার ট্যালেন্ট এর একটা পরীক্ষাও হতো আর তার বিকাশেরও একটা সুযোগ হতো। তাই একদিন ভোরবেলা আমি আনিকার সাথে যোগাযোগ করলাম।
-হাই! কি খবর? …আমাকে দেখে ও বলে
-হেয়! এইতো ভালো। তোমার?
-চলছে মোটামুটি। তা তুমি হঠাৎ করে এতো শুকিয়ে গেলে কেন? …ও আমাকে জিজ্ঞেস করলো।
-ও কিছুনা। এমনিতেই। তা প্রজেক্ট-009 এর খবর কি?
-খবর তো প্রায় ভালোই বলা যায়।
-কেন? কি হয়েছে? আমাকে সব খুলে বলো। …আমি ওর কাছে জানতে চাইলে ও আমাকে সব খুলে বলে। যার সারসংক্ষেপ হচ্ছে-
আমার দেয়া হার্ডডিস্ক এর সাহায্যে ওরা মাফিয়াদের সংস্থা যেটার অফিসিয়াল নেইম ‘ব্লাক মাম্বা’ তার প্রধান হেডকোয়ার্টার খুজে বের করে। তারপরে সেখানে গোপনে আক্রমন করে ওরা পুরো প্রজেক্ট টাকে বাতিল করে দেয়। ব্লাক মাম্বা এর অন্যান্য ঘাটিগুলো সম্পর্কে অন্যদেশগুলোর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে জানিয়ে দেয় সিআইএ। যার ফলে মানবজাতীর ধ্বংসের দ্বার প্রজেক্ট-009 চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এতকিছু সত্বেও ওরা পালের গোদা ডঃ লেস্টার ও তার একান্ত নিজস্ব, বিশ্বাসযোগ্য পাঁচ সহচরকে ধরতে পারেনি। ওরা সিআইএ এর ফাঁদের সুতো কেটে বের হয়ে যায়। একারণে ও বলেছে যে খবর প্রায় ভালো।
-এখন তারা কোথায়?
-তা আমরা আর ট্রেস করতে পারিনি।
-ওহ। আচ্ছা।
-হুম। তো তুমি নাকি কি যেন বলবে?
-ইয়ে মানে, আনিকা তোমার দেয়া সেই প্রস্তাবটা মানে আমি সিআইএ তে জয়েন করতে চাই।
-আরিহ! তাই নাকি? হুম। বুঝতে পারলাম। আমি জানতাম যে তুমি আসবে। এই বলেই ও একটা কাগজে খস খস করে কি যেন লিখে আমাকে দিলো। সাথে একটা কার্ডও দিলো। তারপর বললো যে কাগজটা পরদিন কার্ডের ঠিকানার লোকটাকে দেখালেই নাকি সে আমার ব্যাবস্থা করে দেবে। আমি খুশি হয়ে ওর গালে একটা কিস করে বিদায় নিলাম।
সে রাত্রে উত্তেজনায় আমার ঘুম আসলো না। পরেরদিন ঘুম থেকে উঠেই আমি তরিঘরি করে খাওয়া শেষ করে দৌড় দিলাম। লোকটাকে খুঁজে বের করতে আমার কোনো সমস্যাই হলো না। আমি তাকে কাগজটা দিতেই সে আমাকে একটা গাড়িতে করে টেলসন স্ট্রিটে নিয়ে আসলো। তারপর সেখানে আমাকে নিয়ে সে একটা টেলিফোন বুথে ঢুকলো। টেলিফোনে সে একটা নাম্বার চাপতেই হঠাৎ করে আমাদের পায়ের নিচের ফ্লোর কেঁপে উঠলো। আর আমি অবাক হয়ে দেখলাম টেলিফোন বুথটা একটা এলিভেটরে রূপ নিয়ে ধীরে ধীরে নিচে নামতে শুরু করেছে।
২.
এলিভেটরটা আমাদের একটা আন্ডারগ্রাউন্ড অ্যাপার্টমেন্টে নিয়ে গেলো। গিয়ে দেখলাম সে এক এলাহি বেপার। বিস্তির্ণ এলাকা জুড়ে বড় বড় সব রুম ও করিডর। নিচে নেমে লোকটা একটা দরজার সামনে গিয়ে একটা ছোট চৌকানা বক্সে চোখ রাখলো। তারপর আইস্ক্যান করিয়ে দরজা খুলে আমাকে নিয়ে ভিতরে ঢুকলো।
আমাকে সবার প্রথমে কোয়ারেন্টাইন করানো হলো। তারপর সেখান থেকে বিভিন্ন ফিজিক্যাল পরীক্ষা নেয়ার মাধ্যমে আমার এবিলিটি সম্পর্কে একটা বায়োডাটা তৈরি করা হলো। আমি খুব শুকনা ছিলাম দেখতে। গায়ে তেমন শক্তিও ছিলো না। কিন্তু আনিকার কৃপায় আমি সব ফিল্ড টেস্টে পার পেয়ে গেলাম। আমার গায়ে কিছু সিরাম ইঞ্জেক্ট করে দিলো সিআইএ এর সুন্দরী ডাক্তাররা। আমারও আইস্ক্যান করিয়ে একটা আইডেন্টি কার্ড তৈরি করে দেয়া হলো যা একাধারে ক্রেডিট কার্ড, পাস কার্ড, আর শারিকেন (চাইনিজদের তৈরি চাকতির মতো ধারালো অস্ত্র যা কবজি ঘুড়িয়ে ছুড়ে মারা হয়) এর কাজও করে। কিছু বেসিক গ্যাজেটস ও দেয়া হলো আমাকে।
প্রায় ৫ ঘন্টার ধাক্কায় আমার খুব ক্লান্তি লাগছে। তাই চিফ ও অন্যান্য সিনিয়র এজেন্টদের সাথে দেখা করে আমি তারাতারি আমার এপার্টমেন্টে চলে আসলাম। এখানে এসেও বিস্ময়ের ধাক্কায় আমার ঘোর লেগে গেলো। এতো অল্প সময়ের ভিতরে আমার বাসা যেন রাতারাতি পালটে গিয়েছে। আমার অগোছালো রুম পুরো ঝকঝক করছে। সাথে আসবাব পত্রেও পরিবর্তন হয়েছে অনেক। উন্নতমানের জীবনের জন্য মৌলিক যা দরকার তার প্রায় সবই আছে সেখানে। একটা ইলেকট্রিকাল নোটপ্যাডে কিছু একটা লেখা আছে সেখানে যা আমার নতুন বিছানার উপর অন করে রাখা আছে। আমি কাছে গিয়ে লেখাটা পড়লাম। সেখানে লেখা রয়েছে – “Welcome to your new life, Agent Y” । আমি একটা হট শাওয়ার নিয়ে শুয়ে পড়লাম। কারণ আমার দেহ আর চলছে না।
এভাবেই শুরু হয়ে গেলো আমার নতুন জীবন। সিআইএ এর এজেন্টদের কাজের কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। যে যেকাজে দক্ষ তাকে ঐকাজ দেয়া হয়। নিজের ইচ্ছামতও লেভেল পছন্দ করা যায়। আমি তাই নিলাম টেকনোলজি আর আর্মস এর লেভেল। পরদিন থেকে আমার ট্রেনিং শুরু হয়ে গেল। আমার ট্রেনিং এ সবসময় সাহায্য করতো আনিকা। প্রথম প্রথম আমার অবস্থা খুব কাহিল হয়ে গিয়েছিলো। সারা শরীরে ব্যাথা আর প্রচুর ক্লান্তি। কিন্তু ধীরে ধীরে আমি সবকিছুতে পারদর্শী হয়ে উঠলাম। নিয়ম মেনে খাবার খাওয়া আর ব্যায়ামের ফলে আমার রোগা শরীর অনেকটাই ফিট হয়ে গেল। আগের চেয়ে গায়ে শক্তিও বেড়েছে।
আমি হ্যাকিং এর ক্ষেত্রে আগে শুধু বেসিক জিনিসগুলো জানতাম। আর এখন প্রায় পুরোটাই বিস্তারিত ভাবে জানি। প্রোগ্রামিং আরো উন্নত হয়েছে আমার সিআইএ তে ঢোকার পরে। এখন প্রায় সবার সাথেই মোটামুটি পরিচিত। অস্ত্র চালনায় ও বিশেষভাবে পারদর্শী হয়ে গেলাম। তাতে অবশ্য আমাকে আমার আগের জীবন থেকে দূরে সরে যেতে হয়নি। আমি আগের মতই পড়াশুনা চালিয়ে যেতে লাগলাম আর নিজের নতুন পরিচয় গোপন রেখে কাজ করে যেতে লাগলাম।
৩.
আজ প্রায় ১ মাস হতে চললো আমি সিআইএ তে ঢুকলাম। মানিয়ে নিয়েছি প্রায়। আমি আমাদের সেন্ট্রাল কম্পিউটারকে নতুন একটা ধাপে নিয়ে গিয়েছি। ভয়েস কন্ট্রোলড অটো অপারেটিং সিস্টেম আর সেলফ হিলার। মানে আমার সেই সফটওয়্যারের সেকেন্ড জেনারেশন আর কি! কম্পিউটারে কোনো সমস্যা হলেই ১৫ মিনিটের মাথায় সেটা নিজে থেকে সারিয়ে তোলার কাজ নেবে। সেটা ব্যবহার করে আমি প্রথম টেস্ট করার সময় প্রজেক্ট-009 এর সম্পর্কে জানতে চাই রোলোর কাছে। ওহ! হ্যা। আমাদের নতুন অপারেটিং সিস্টেমের নাম রোলো। সারা হেডকোয়ার্টার জুড়ে ওর স্পিকার আর সাউন্ড সিস্টেম দেয়া আছে আর আছে হলোগ্রাফিক 3D ভিশন সিস্টেম। তার ফলে যেখানে ইচ্ছা সেখানে বসে ওর সাথে কথা বলা যায়। রোলো নিজে থেকে প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো আমাকে দেখালো আর ডঃ লেস্টার এর ছবি দেখালো হলোগ্রাফিক ভাবে। মানুষ টা দেখতে শুকনোমতন আর চোখের নিচে একটা কাটা দাগ আছে। সেই চোখে রয়েছে একই সাথে বুদ্ধি আর নিষ্ঠুরতার ঝিলিক। পাশে তার সহচর ৫ জন। সবাই এ তরুণ। দেখলাম সিস্টেমটা মোটামুটি ভালই কাজ করছে। তখন্ সেটা সবাইকে দেখালাম আর আমার মর্যাদাও অনেক বেড়ে গেল। আমি প্রমোশন পেয়ে গেলাম আর এখন আমি জুনিয়র এজেন্ট হয়েও সিনিয়রদের সাথে কাজ করতে পারছি।
পরেরদিন আমি আমার এক সহকর্মী ক্রিস এর সাথে কাজ করছি আর কথা বলতেছি।
-হেই ওয়াই, কি করছো এইটা!
-কেন? এভাবে করলেই তো সব আনট্রাসটেড ডাটাগুলো বের হয়ে যাবে।
-হুম। তা তো হবে কিন্তু তোমার সিস্টেমের পুরা বারোটা বেজে যাবে। আরে আমার কাছে দাও। প্রথমে একটা প্রটেকশন ওয়াল তৈরি করে নিতে হবে। এভাবে… বলেই ও আমাকে সাহায্য করতে লাগলো। প্রায় মিনিট তিনেক পর ও আমাকে ফেরত দিলো ল্যাপটপটা।
-ইয়েস! ইউ আর এ জিনিয়াস ক্রিস! অনেক ধন্যবাদ।
-আরে কোনো বেপারই না। এনিটাইম। আরেহ! ঐটা কে? নিউ কেউ নাকি? বলে ক্রিস খানিকটা অবাক হলো আর আমি ওর দৃষ্টি লক্ষ করে তাকালাম।
একটা মেয়েকে দেখা যাচ্ছে। অনেক সুন্দরী আর বেশ লম্বা। বয়স প্রায় আমার সমান। একটা কালো ওভারঅল পরে আছে। চেহারা সুন্দর হলেও তাতে একটা কঠোরতার ছাপ দেখা যাচ্ছে। আমার কাছে পরিচিত মনে হলো। কোথায় যেন দেখেছি এই মুখ। কিন্তু এখন আমি মনে করতে পারছি না। যাই হোক, মেয়েটার প্রতি আমি মনে মনে দূর্বল হয়ে পড়ি। কিছুক্ষন পর চিফ এসে ওকে সবার সাথে ওকে পরিচয় করিয়ে দিলো। নাম জেনি। সবার সাথে হ্যান্ডশেক করার পর ও যখন আমার হাতটা ধরলো তখন আমি যেন কেমন ঘোরের মধ্যে চলে গেলাম। খানিক সময় পর হাত ছাড়ছি না দেখে ও যখন ঝাঁকি দিলো তখন আমি সম্বিত ফিরে একটা বোকার মত হাসি দিয়ে যেন পালিয়ে বাচঁলাম।
জেনি কয়েকদিনের ভিতর সবার সাথে ভালোভাবে পরিচিত হয়ে গেলো। আসলে এখানে খুব চিন্তা ও বিশ্লেষণ করে নতুন সদস্য নেয়া হয়। সদস্যদের খুঁজে বের করা হয় তাদের কাজের মাধ্যমে। এ জন্য আমাদের অনেক সোর্স আছে। জেনি একটা স্কুলকে বাঁচিয়েছে বোমায় উড়ে যাওয়ার হাত থেকে। সেটা আরেক কাহিনী।
সিআইএ তে নতুন একটা টেস্টের আয়োজন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে এজেন্টদের সাহস আর প্রতিকূল পরিবেশে বেচেঁ থাকার উপর দক্ষতার পরীক্ষা হবে। এটা একটা প্রতিযোগিতার মত যা সবার জন্য বাধ্যতামূলক নয়। আমি নিজের উপর ভরসা রাখি। তাই আমি এতে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।
৪.
সারভাইভাল টেস্টটি হবে আফ্রিকায়। ১২ জন এজেন্ট নিয়ে আফ্রিকায় রওয়ানা হলো একটি হেলিকপ্টার। তার ভিতর আমি আছি, সাথে জেনি ও। আমাদের জঙ্গলে একটা স্পটে ছেড়ে দেয়া হবে। সেখান থেকে তিনদিনের পথ পাড়ি দিয়ে আমাদের শেষ গন্তব্যে পৌছাতে হবে। যে আগে যেতে পারবে সেই জয়ী হবে। শুনে খুব সাধারণ মনে হচ্ছে। কিন্তু প্রত্যেক এজেন্ট এর কাছে একটা চাকু ছাড়া আর কিছু থাকতে পারবে না। নিজের খাবার নিজেরই খুঁজে নিতে হবে। আর ঐ একটা চাকু দিয়েই বন্য প্রানী হতে নিজেকে বাঁচাতে হবে। সাথে কোনো প্রকার গ্যাজেট বা কমিউনিকেশন ডিভাইস থাকতে পারবে না। জীবন মরণ খেলা। তাই যারা এই টেস্টে নাম দিয়েছে তারা প্রায় নিজের মৃত্যুর দলিলে সাক্ষর করে এসেছে।
আমি সেখানে যাওয়ার আগে আফ্রিকা সম্পর্কে রোলোর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো জেনে নিয়েছি। কিভাবে প্রকৃতিকে কাজে লাগিয়ে খাবার খুঁজে, পানি খুঁজে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে হয় তা আয়ত্ব করলাম। বিষাক্ত জিনিস কোনটা তা জানা, বন্যজন্তুকে খালি হাতে মারা প্রায় সব কিছুই জেনে নিলাম। অনেকেই একটা ভুল করে থাকে। আর তা হলো না জেনে অচেনা স্থানে যাওয়া আর বেঘোরে মরা। তাই একটা চাকু এর উপর নিজের জীবনের বাজী না রেখে নিজেকে যতটুকু সম্ভব প্রস্তুত করে আমি টেস্টে যোগ দিলাম।
হেলিকপ্টার থেকে আমাদের জঙ্গলের ভিতরে নামিয়ে দেয়া হলো আর একটা কম্পাস ও দেয়া হলো। টেস্ট অবজারভার আমাদের বলে দিলেন যে কম্পাস ধরে সোজা পশ্চিম দিকে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে আর তারপর আমরা একটা নদী পাবো। সেই নদী ধরে উত্তরে গেলেই আমাদের গন্তব্য খুঁজে পাবো। সবার পড়নেই সিআইএ এর একই স্পেশাল ড্রেস। সবাইকে আলাদা হয়ে যেতে হবে। আমরা নিজেদের মধ্যে হ্যান্ডশেক করে আলাদা হয়ে পরলাম।
আলাদা হওয়ার পর আমি প্রথমেই চিন্তা করলাম যে রোলো আমাকে কি কি বলেছিলো। প্রথমেই নিজের আত্ম্রক্ষার ব্যবস্থা শক্ত করতে হবে। এই ছোট্ট চাকু দিয়ে কোনো মাঝারি বা বড় জন্তুকে সামলানো যাবে না। তাই একটা গাছের ডাল কেটে তার মাথায় আমি চাকুটা শক্ত করে বাঁধলাম একপ্রকার লতা দিয়ে। সারা আফ্রিকায় প্রাকৃতিক উপাদানের ছড়াছড়ি, আর তা শুধু কাজে লাগাতে পারলেই হলো। এর ফলে আমার একটা বল্লম হলো যেটা চাকুটার থেকে অস্ত্র হিসেবে ভালো। তারপর আমি কম্পাস দেখে পথ চলতে শুরু করলাম।
আফ্রিকায় এখন বর্ষাকাল। তাই পানির অভাব হচ্ছে না। বড় পাতা মোচার মত বানিয়ে তাতে দুই মিনিটেই পানি ভরে খাওয়া যায়। আমি বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে এগোতে লাগলাম। প্রায় ৪ ঘন্টার মত হাঁটলাম আমি। এর মধ্যে ২ বার বসে বিশ্রাম নিয়েছি। মাঝেমাঝে বৃষ্টি থেমে যায় আর রোদ উঁকি দেয়। আমি দুইটা শূয়োর আর একটা গিরগিটি দেখলাম। পেটের মধ্যে ক্ষিদে জানান দিচ্ছে। কিন্তু খাওয়ার মতো কিছু খুঁজে পেলাম না। কিছুদূর যাওয়ার পর একটা ছোট জলাশয় দেখতে পেলাম। তার পাশে একটা গাছে কিছু ফল দেখতে পেলাম।বল্লম দিয়ে খোঁচা মেরে কিছু ফল পেড়ে আপাতত তা খেয়ে নিলাম। এবার একটা জিনিস আমার নজরে এলো।
জলাশয়টার পাশে একটা নিচু গর্তে কিছু মাছ দেখতে পেলাম। হয়তো বৃষ্টির পানিতে গর্তে এসে আর ফিরে যেতে পারছে না পানি কমে যাওয়ায়। আমি তাই তাড়াতাড়ি আমার জামাটা খুলে তা গর্তে পানির উপর পেতে দিলাম অনেকটা জালের মতো। আর মাছগুলো তার উপর আসতেই থলের মতো করে আমি জামাটা টেনে তুললাম। বাহ! দুইটা ছোট শ্যামন পাওয়া গিয়েছে। মাছ দুইটা মেরে আমি আমার পকেটে ভরে আমি আবার চলতে লাগলাম।
আজ প্রায় দুই দিন হলো আমি বা আমরা জঙ্গলে অবস্থান করছি। এখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। আগের দুইদিনের একটানা হাঁটার ফলে আমার সারা গায়ে ব্যাথা। পা যেন আর চলতেই চাচ্ছে না। জামা তো জায়গায় জায়গায় ফুটো হয়ে বা ছিড়ে গিয়েছে। কালকে সকালের মধ্যে মনে হয় নদীর তীরে পৌছে যাব। এর মধ্যে একবার আমাদের এক এজেন্ট এর সাথে দেখা হয়েছে। তার দশা আরও করুণ। এ দুইদিন সময়ে অসময়ে খেয়েছি আর মোটামুটি ভালই কেটেছে আমার। শুধু আগুন জ্বালাতে আমার সমস্যা হয়েছে। আর্দ্র জায়গা বলে আগুন জ্বালানো একটা দুঃসপ্ন ছিলো। কিন্তু রোলোর দেয়া বিদ্যার মাধ্যমে আমি তা করতে সক্ষম হয়েছিলাম। এখন আবার আগুন জ্বালাতে হবে। আজকের দিনটায় আমি রাতে হাঁটবো বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। তাহলে হয়তো আমি অন্যদের তুলনায় খানিকটা আগানো থাকবো। তাই রাতে চলার জন্য এখন আমার আগুন দরকার।
আগুনের জ্বালানির সন্ধানে আমি এগিয়ে গেলাম। আমার কাছে গতকালকের পাওয়া একটা মরা হায়েনার খানিকটা চর্বি আছে। তা দিয়ে আগুন বেশি সময় ধরে রাখা যাবে। পকেটে খাবারও আছে। কচ্ছপের মাংস। তাই এ নিয়ে চিন্তা নেই। আজকে আবহাওয়া অনেকটা ভালো। রাতে বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা নেই প্রায়। তাই আগুন সাথে নিয়ে আমি হাঁটতে পারবো মনে হয়। কিন্তু আমার ভাগ্যে হয়তো আর কিছু লেখা ছিলো।
কিছুদূর এগোতেই দেখলাম সামনে কালো ঢিবির মত কি যেন পড়ে আছে। হয়তো কোনো মরা জন্তু। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতেই বিস্ময়ে আমার মুখ দিয়ে বেড়িয়ে এলো
-আরিহ! জেনি! এখানে এভাবে? আমি নিজেকেই প্রশ্ন করলাম। জেনি ঘাসের উপর অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। মরে গেছে কিনা কে জানে! তাড়াতাড়ি নাকের সামনে হাত দিলাম। খুব ধিরে নিশ্বাস পড়ছে ওর। বেঁচে আছে দেখে আমি একটু স্বস্তি পেলাম। কিন্তু এভাবে বেশিক্ষণ পড়ে থাকলে ও নির্ঘাত মারা যাবে। কাউকে যে খবর দেবো তারও উপায় নেই। ওদিকে এখন ওকে বাঁচাতে গেলে আমি টেস্টে হেরে যাবো। কিন্তু আমি টেস্টের পরোয়া করলাম না। আমি ওর সেবা করার সিদ্ধান্ত নিলাম। জানি না। হয়তো সেইদিন প্রথম দেখায় ওর প্রেমে পড়াই হয়তো আমাকে এজন্য বাধ্য করেছে।
আমি পর্যবেক্ষণ করে দেখলাম যে জায়গাটায় আমরা আছি সেখানে আজকে রাতটা কাটানো যাবে। তাই আমি একটা মাঝারি সাইজের ক্যাম্প ফায়ার বানিয়ে তার পাশে রাত কাটানোর মত একটা আস্তানা তৈরি করলাম। আস্তানার ভিতর জেনিকে কোলে তুলে এনে শুইয়ে দিলাম। ও হয়তো খাবার না খেয়ে অসুস্থ হয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে। আমি একটা বাঁশের খোলে পানি এনে ফুঁটালাম, যেটা আগের রাত্রের বৃষ্টিতে জমা হয়েছিল। তারপর একটা বাঁশের কঞ্চির চামুচ দিয়ে অজ্ঞান জেনিকে পানি খাইয়ে দিলাম। তারপর আগের জমা রাখা কচ্ছপের মাংস পুড়িয়ে নিজে খেয়ে নিলাম। হয়তো সাধারণ অবস্থায় এই খাবার দেখলেও বমি করবো। কিন্তু এখন ক্ষুধার তাগিদে মসলা, লবণবিহীন এই খাবার খুব মজা করে খেলাম। তারপর বাঁশের খোলস দিয়েই পাত্র বানিয়ে তাতে পানি আর মাংস দিয়ে জেনির জন্য স্যুপ বানালাম (বাঁশের ব্যবহারের বুদ্ধিটাও রোলোর দেয়া।) তারপর ওকে যতটুকু পারলাম খাইয়ে দিলাম। আগুনের আলোয় জেনির ফর্সা মুখটা চকচক করছে। এতো মায়াবি চেহারা আমি আগে কারও দেখিনি। হয়তো এই অজানা জায়গায় এই কিছু মুহূর্তের কথা আমার আজীবন মনে থাকবে। আমি শুধু ওকে দেখতে লাগলাম আর বার বার নতুন করে ওর প্রেমে পড়তে লাগলাম। কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম, টেরই পেলাম না।
সকালবেলা কারও ডাকে আমার ঘুম ভাঙ্গলো। আমি ধরমর করে উঠে বসলাম। দেখলাম জেনি জেগে গিয়ে আমাকে ডাকছে। ওর চোখ হালকা লাল। তা বাদে মনে হয় মোটামুটি সামলে নিয়েছে।
-ইয়ে, মানে কি হয়েছিলো? তুমি এখানে এলে কিভাবে? জেনি আমাকে জিজ্ঞেস করলো।
-তুমি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলে মাটির উপর। আমি না থাকলে হয়তো নিশাচর শিকারির পেটে যেতে এতক্ষণে।
-মানে? কি হয়েছিলো আমার?
-সঠিক বলতে পারবো না। যতদূর মনে হয় খাবারের অভাবে দূর্বল হয়ে গিয়েছিলে।
-ওহ! হ্যাঁ। মনে পড়েছে। এতো চেষ্টা করলাম, কিন্তু খাওয়ার কিছু পেলাম না। তা তুমি আমার সাথে উলটা পালটা কিছু করোনি তো আবার?
-নাহ… আমি ঐরকম ছেলে নই। আমি খানিকটা রাগ হয়েই বললাম। আমি আমার জিনিস গুছিয়ে যাওয়ার উপক্রম করতেই ও পিছন থেকে ডাক দিলো। এমনিতেই মেজাজ খারাপ হয়ে গিয়েছে ওর কথায়।
-এই দাঁড়াও! আমাকে রেখে কোথায় যাচ্ছো?
-টু দি হেল।
-এই, রাগ করো না। আমার মাথা ঠিক নেই আসলে। আমি খুব দূর্বল। প্লিজ আমাকে একা রেখে যেও না। আমার জীবন বাঁচানোর জন্য তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। পরে হয়তো কোনোদিন আমি এর প্রতিদান দেব।
কি আর করা! না পারি সইতে, না পারি ছাড়তে। তাই ওকে নিয়ে আমি কম্পাস দেখে চলা শুরু করলাম। ও আমার কাঁধে ভর দিয়ে হাঁটছে। এভাবে ঘন্টাখানেক যাওয়ার পর আমরা নদীর পাড়ে পৌছলাম। এইসময় টুকু ও অবিরাম কথা বলে আমার কান ঝালাপালা করে দিলো। যে মেয়ে আগে খুব চুপচাপ থাকতো আজ সে কথার বান ডেকেছে।
নদীর তীর ধরে কিছুদূর এগোতেই সিআইএ এর স্পেশাল বোট দেখতে পেলাম। তারপর তাতে করে এই অসীম পরীক্ষা থেকে বের হয়ে আসলাম আমরা। এখন শুধুই বিশ্রাম দরকার। আর পারছি না! এবার ঘরে ফেরার পালা।
৫.
সেদিন আমি টেস্টে হয়তো বিজয়ী হতে পারিনি কিন্তু আমার ভালোবাসাকে রক্ষা করতে পেরেছিলাম। সেদিনের পর থেকে জেনির আচরণও সম্পূর্ণ বদলে গেল। এখন প্রায় আমার সাথেই থাকে হেডকোয়ার্টারে কাজ করার সময়। আমরা এখন খুব ভাল বন্ধু যদিও আমি যে ওকে ভালবাসি তা এখনো বলিনি।
আমি এখন টেকনোলোজি লেভেলে কাজ করছি। এজেন্টদের উপর কৃত্রিমভাবে জি ফোর্স এর প্রভাব ফেললে তারা কতটুকু তা সইতে পারবে তার পরীক্ষা। সাধারণত মিলিটারি ট্রেনিং এ এগুলো করা হয়ে থাকে। ওদের যন্ত্রটা হল একটা ঘূর্ণায়মান সিট। ঘূর্ণির গতি বাড়িয়ে সেখানে জি ফোর্স বাড়ানো হয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের যন্ত্রটা একটু উন্নত। আমি রোলোকে ভয়েস কমান্ড দিতেই ও সেটার একটা ডিজাইন তৈরি করে দেয়। সে অনুযায়ী কাজ করে আমাদের নতুন জি ফোর্স এন্ড এন্টি জি ফোর্স রুম আজ তৈরি শেষ হল। তারই ফিল্ড টেস্ট হবে আজকে।
কেউ স্বেচ্ছায় ফিল্ড টেস্টের জন্য রাজী হচ্ছে না। তাই আমি নিজেই যাবো বলে ঠিক করলাম। আমি রুমটার মধ্যে ঢুকে রোলোকে বললাম প্রথমে এন্টি গ্রাভিটি দিতে। তাই প্রায় ৫ সেকেন্ড পরেই আমি মাটি থেকে শূন্যে ভাসতে শুরু করলাম। সে এক অসাধারণ অনুভূতি। প্রথমে তো সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারলাম না। যখন দাঁড়ালাম তখন অবস্থা বেসামাল। বারবার কাত হয়ে পরে যাচ্ছি। মহাকাশে শূন্যের মত ভাসতে পারবো আমরা আজ থেকে পৃথিবীর বুকেই। রুমের কাঁচের দেয়ালের বাইরে তাকিয়ে দেখি অনেকেই ঈর্ষার দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। অনেকে আবার খুশিতে দাঁত বের করে হাসছে। সিআইএ এর সব এজেন্ট ও স্টাফরা বাইরে দাঁড়িয়ে আমার ও আমার সহকর্মীদের এ অসামান্য কীর্তি দেখছে।
কিন্তু হঠাৎ করে পুরো হেডকোয়ার্টার এর পাওয়ার সাপ্লাই বন্ধ হয়ে গেল। সব লাইট আর অন্যান্য সবকিছু বন্ধ হয়ে গেল। আর আমি খুব জোরে মাটির উপর আছড়ে পড়লাম। কয়েক সেকেন্ড পরেই কিছু স্মোক বম্ব এসে বাইরের রুমের ভিতর পড়লো আর দেখতে দেখতে বাইরের সবাই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলো। আমিও মাথায় খুব ব্যাথা পেয়েছি। তাই গ্যাসের প্রভাবে নিজের চেতনাও বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারলাম না। অজ্ঞান হয়ে গেলাম আমি।
কতক্ষণ অজ্ঞান ছিলাম আমি জানি না। ধীরে ধীরে আমার জ্ঞান ফিরে এলো। আমার মাথার পিছনে দপ দপ করছে। অনেক কষ্টে চোখ খুলে তাকালাম। প্রথম দিকে সব কিছু ঝাপসা দেখলাম। কিছক্ষণ পর আই ভিউ এ্যাডজাস্ট হতেই আমি দেখতে পেলাম। ছোট একটা লাইট জ্বলছে রুমের ভিতরে।
আমি আমাদের গ্রাভিটি রুমে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছি। এই রুমের ভিতরে আমি, জেনি আর একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে। জেনিই আমার মুখের উপর পানির ঝাপটা মেরে আমার জ্ঞান ফিরিয়ে এনেছে। আমার দৃষ্টি একটু পরিষ্কার হতেই আমি লোকটার দিকে তাকালাম আর সাথে সাথেই ভয়ানক চমকে উঠলাম। ব্লাক মাম্বার ক্রিয়েটর ডঃ লেস্টার দাঁড়িয়ে আছে তার নিজস্ব ভঙ্গিতে। শুকনো মত মানুষটার চোখের সেই বুদ্ধিমত্তা আর নিষ্ঠুরতার ঝিলিক আজ নিজের চোখে দেখতে পেলাম। কিন্তু সে এখানে সিআইএ এর গোপন হেডকোয়ার্টারে আসলো কিভাবে? আর বাকি এজেন্টরা গেলো কই? আমি আপন মনে চিন্তা করতে লাগলাম।
৬.
খানিকটা পরেই আমি আমার উত্তর পেয়ে গেলাম। আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াতেই লেস্টার তার হোলস্টার থেকে একটা ম্যাগনাম ৫০০ বন্দুক বের করে আমার দিকে তাক করে ধরে রাখলো। আমি কাচেঁর বাইরে তাকাতেই আমি আমার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলাম। বাইরে কয়েকজন স্পেশাল ড্রেস আপ করা লোক সব এজেন্ট আর স্টাফদের অজ্ঞান হওয়ার ইঞ্জেকশন দিচ্ছে। কিন্তু আমাকে দিলো না কেন বুঝতেছি না। আমি গুণে দেখলাম তারা চারজন আছে বাইরে।
-এরাই কি সেই সিলেক্টেড ফাইভ! তাহলে পাঁচ নম্বরজন কই? আমি নিজেকে প্রশ্ন করলাম। আর বুঝতে পারলামও সাথে সাথে। আমি সরাসরি জেনির দিকে তাকালাম। জেনির পরনেও সেই একই পোশাক। এখন আমি বুঝতে পারছি কেন ওকে প্রথমদিন দেখে চেনা চেনা লেগেছিলো। আমি রোলোর দেখানো ছবিতে ওকে দেখেছিলাম। কিন্তু সে সময় ওকে দেখে মোটেও মেয়ে বলে বোঝা যায়নি। চুল এর আকার ছিলো ছোট আর রঙ ছিলো কালো। এই সিলেক্টেড ফাইভ এর কোনো রেকর্ড ছিলো না। তাই আমরা ঘুনাক্ষরেও ওকে চিনতে পারিনি।
-এ ই কি সেই? লেস্টার প্রশ্ন করলো জেনিকে।
-হুম। হি ইজ ওয়াই।
-আমাকে ওর সাথে কথা বলতে দাও।
-আচ্ছা ডঃ। বলেই জেনি পাশে সরে গেলো।
আমার মাথায় তখন ঝড়ের বেগে চিন্তা চলছে। লেস্টার হয়তো তার প্রতিশোধ নিতে ফিরে এসেছে। আমি ওর প্রজেক্ট 009 নষ্ট করেছিলাম। এখন হয়তো ও আমাকে মেরে এর বদলা নেবে। সাহায্যের সব উপায় বন্ধ। আমার সাথে কোনো অস্ত্র নেই। সাথে সব এজেন্ট অজ্ঞান আর রোলোও অকেজো। রোলো!! হুম। মনে পড়েছে। রোলোর তো নিজেকে সারিয়ে নেয়ার ক্ষমতা আছে। ওর এলগরিদম এমনভাবে করা হয়েছে যাতে একটা অংশ নষ্ট হলে আরেকটা ১৫ মিনিট পর নিজ থেকেই চালু হয়ে যাবে। তখন হয়তো কিছু একটা করা যেতে পারে। এই ১৫ মিনিটের প্রায় ৫ মিনিট পার হয়েছে। বাকি ১০ মিনিট আমাকে যে করেই হোক আমাকে ডঃ লেস্টারকে আঁটকে রাখতে হবে। নাহলে আমি নিজেও মরবো। সাথে বাকিরাও মরবে।
-কি চাও তুমি? আমি কোনো ভণিতা না করেই সরাসরি লেস্টারকে জিজ্ঞেস করলাম।
-কি চাই! তা তো তোমার খুব ভালো করেই জানা উচিৎ মি. জিনিয়াস! তুমি আমার আজীবনের সাধনাকে নষ্ট করেছো।
-কি বলছো? আমি কিছু বুঝতেছি না।
-সবুর করো। বলছি। আমার আজীবনের স্বপ্ন ছিলো এই প্রজেক্ট 009। শুধু তোমার বোকামির কারণেই আজ আমার স্বপ্ন নষ্ট হলো।
-কি স্বপ্ন? উন্নত দেশগুলোর ধ্বংস করে গরীব দেশগুলোর হাতে হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে পৃথিবী ধ্বংস করা? আমি খোঁচা মেরে জানতে চাইলাম।
-চুপ কর মুর্খ কোথাকার। তা বোঝার বয়স তোমার এখনো হয়নি। হ্যাঁ, যা বলছিলাম। আমি চেয়েছিলাম পুরো পৃথিবীকে একটা রাষ্ট্রের নিচে আনতে। হিটলার যেটা পারেনি আমি তা শেষ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তুমি! এই তুমি আমার পুরো প্ল্যান নষ্ট করে দিয়েছো। আমার বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের খেলা শেষ হয়েছে শুধু তোমার জন্যে। তাই আমি তোমাদের ধ্বংস করতে এসেছি। তারপর প্রজেক্ট 009 আবার নতুন করে শুরু হবে। এখন তুই টের পাবি অ্যামেরিকান কুকুর! রাগে লেস্টারের চোখ লাল হয়ে গেছে।
গালিটা শুনেও আমার মাথায় রক্ত উঠে গেল। আমি চেচিয়ে উঠলাম
-খবরদার মুখ সামলে কথা বলো! আমি এদেশের লোক না। আমি একজন বাংলাদেশী আর আমি আমার দেশকে তোমার মত শয়তানের হাত থেকে বাঁচানোর জন্যই এমন করেছি।
-ভালো করেছিস। জেনি শুট হিম নাউ।
জানি এসে আমার মাথায় ওর বন্দুক ধরলো। আমার হাতে হয়তো আর সময় নেই। রোলো এখনও এক্টিভেট হয়নি। আমি জেনির চোখের দিকে তাকালাম। বললাম
-আমাকে মারার আগে জেনে রেখো কেউ হয়তো তোমাকে সত্যিকারের মত ভালোবাসতো। আমার চোখে দেখলে হয়তো তুমি বুঝতে পারবে। লেস্টার তোমাদের ব্রেইন ওয়াস ছাড়া আর কিছুই করেনি। প্লিজ বিলিভ মি। আই লাভ ইউ।
হয়তো জেনিও আমাকে ভালোবাসতো। তাই আমার চোখের দিকে তাকাতেই ওর হাত থেকে বন্দুক পড়ে গেলো। কিন্তু লেস্টার থেমে নেই। ম্যাগনাম ৫০০ গর্জে উঠলো সগর্বে। আর আমি কিছু বোঝার আগেই আমার সামনে জেনি নিজেকে মেলে ধরে গুলি থেকে আমাকে আড়াল করে ফেললো। ওর চোখ থেকে একফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো আর ও আমার হাতের উপর পড়ে গেল। আমার বুকে খুব জোড়ে একটা ধাক্কার মত লাগলো। জেনি ওর কথা রেখেছে। আমার জীবন বাচিঁইয়েছে ও। কিন্তু নিজে গুলি খেয়ে।
আমি জেনিকে মাটির উপর রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ালাম। রাগে দুঃখে আমার মাথায় আগুন ধরে গেলো। বললাম
-ইটস শো টাইম লেস্টার। রোলো, গ্রাভিটি চেম্বারের দরজা বন্ধ করে দাও।(রোলো ততক্ষণে একটিভেট হয়ে গিয়েছে) চেম্বারে ম্যাগ্নেটিক ফোর্সফিল্ড অন করো।
-ইয়েস স্যার। ডান। বললো রোলো।
সাথে সাথে চৌম্বকিয় আকর্ষণের ফলে লেস্টারের হাত থেকে বন্দুক ছুটে দেয়ালে গিয়ে লাগলো আর চেম্বারের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
তারপর আমি আবার বললাম রোলোকে চেম্বারের বাইরে ক্লোরোফর্ম গ্যাস দিতে। আর সিলেক্টেড ফাইভও জ্ঞান হারালো। শুধু আমি আর লেস্টার দাঁড়িয়ে আছি গ্রাভিটি চেম্বারের ভিতর। লেস্টারের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। ও ছুটে গিয়ে দেয়াল থেকে ওর বন্দুক ছাড়ানোর ব্যার্থ চেষ্টা করলো। তারপর আমাকে বলল
-তুমি কত চাও?
-আমাকে কেনা যায় না লেস্টার। তুই মানুষ চিনতে ভুল করেছিস। এই বলেই আমি রোলোকে জিরো গ্রাভিটি দিতে বললাম। আর সবকিছু শূন্যে ভাসা শুরু করতেই আমি আমার আইডি কার্ড বের করে একটা বিশেষ জায়গায় চাপ দিতেই ওটা খুলে তিনটা শারিকেনে রুপ নিলো।
-গেম ওভার ডঃ। প্রজেক্ট 009 এবার চিরতরে খতম। বলেই আমার হাতের শারিকেন গুলো আমি ছুড়ে মারলাম লেস্টারের গলা বরাবর। হাজারবার অনুশীলনের কারণে সেগুলো নিখুঁত নিশানায় লেস্টারের গলায় ঢুকে গেলো। আর তার নিথর দেহটা শূন্যে ভাসতে লাগলো।
১ মাস পর। প্রজেক্ট 009 চিরতরে পৃথিবী থেকে চলে গেলো। আর আমাকে সর্বোচ্চ সম্মান দেয়া হলো সিআইএ তে। আমি এখন জেনির সাথেই খুব সুখে আছি। পিছন থেকে গুলি লাগায় ও আর বেশি আহত হয়নি। দ্রুতই সেরে উঠেছে। আমি এখন অপেক্ষায় আছি যেদিন জেনি আমাদের সন্তানদের এক লিজেন্ডের কথা বলবে যার নাম পৃথিবীর প্রত্যেক গোপন গোয়েন্দা সংস্থায় আর ইতিহাসের পাতায় জ্বলজ্বল করবে, যে পৃথিবীকে রক্ষা করেছিলো এক মহাবিপর্যয়ের হাত থেকে। সে হলো এজেন্ট ওয়াই!
সমাপ্ত।