
Story
মি ফিকশনিস্ট
১.
তার স্বপ্ন যাত্রা শুরু হয়ে গিয়েছে। অনেকগুলো সংখ্যা আর চিহ্ন দেখতে পাচ্ছে সে। সাথে আছে অনেক রকম রং। নানা রকম জ্যামিতিক প্যাটার্ন তৈরি হচ্ছে আবার নিমিষে মিলিয়ে যাচ্ছে। যদি কোথাও বৃত্ত তৈরি হয় তবে সেই বৃত্ত থেকে আবার বিভিন্ন কনিকের সৃষ্টি হচ্ছে। তার ভিতরে একটা অস্থিরতা কাজ করছে। সে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে। লুসিড ড্রিম বুঝতে পারলেও সে সামনে আগানোর চেষ্টা করে। সময়, স্থান ছিন্ন হয়ে যেতে থাকে, তৈরি হয় তরঙ্গ। ভেক্টর ফিল্ডের মাধ্যমে সে তৈরি করে ফেলে স্বপ্ন তরঙ্গ সমীকরণ।
২.
১৫/৮/২০২০
মি রেজাউল করিম বসে আছেন তার বাসার ড্রইং রুমে। তিনি বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট ধনী লোক। একবার হিসাব করে দেখা হয় তার দৈনিক আয় প্রায় ১২ লাখ টাকা। এই টাকা আসে তার বিভিন্ন কোম্পানি, মিল, ব্যাংক ইত্যাদি শাখা প্রশাখা থেকে। তার স্ত্রী ও একটি মেয়েকে নিয়ে তিনি সুখেই আছেন।
-স্যার কিছু লাগবে আপনার?
ডাক শুনে রেজাউল করিম ফিরে তাকান। ছেলেটি নতুন এসেছে, তার পিএস। এখনও ওর সাথে তার ভালভাবে কথা হয়নি। তার আগের পিএস ছেলেটিকে ঠিক করে দিয়ে গিয়েছে।
-নাহ, কিছু লাগবে না। তুমি একটু বসো। কথা বলি তোমার সাথে।
-জ্বী, স্যার।
-আচ্ছা শিহাব তোমার কি হয়?
-দূর সম্পর্কের চাচা।
-তুমি নাকি ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে নাকি পাস করেছো?
-জ্বী, স্যার। অ্যাপলাইড ফিজিক্সে।
-ফিজিক্সে পড়ে তুমি পিএস এর চাকরি নিলে কেন?
-স্যার আমি আরও পড়তে চাই। তাই ফরেনে যাওয়ার জন্য টাকা জমাচ্ছি।
-ভেরি গুড। তা কাজ ছাড়া তুমি আর কি জানো?
-স্যার আমি ম্যাজিক দেখাতে পারি।
-ম্যাজিক! আমার প্রিয় বিষয় ছিল একসময়। আমিও ম্যাজিক প্রাকটিস করেছিলাম প্রথম যৌবনে। তোমাকে দেখে ভাল লাগল ইয়াং ম্যান। আজকাল ছেলেমেয়েরা মোবাইল ছাড়া আর কিছুই বোঝে না। পরে একসময় তোমার ম্যাজিক দেখবো। এখন কাজ করো গিয়ে।
-আচ্ছা স্যার।
ছেলেটি আস্তে করে বের হয়ে যায়। মুখে থাকে তার এক চিলতে হাসি।
৩.
১৬/৮/২০২০
সন্ধ্যায় রেজাউল করিম ম্যাজিক দেখার জন্য বসে আছেন। কোনো এক অজানা কারণে ছেলেটি শুধু তাকে একাই ম্যাজিক দেখাতে চায়। তিনি বেশ আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন। ছেলেটি আসলো সাধারণ পোশাকেই।
-স্যার আমি যে ম্যাজিকটা আপনাকে দেখাবো তা আগে কাউকেই দেখাই নি।
-বাহ দারুণ তো। নাও বাপু শুরু করো।
-জ্বী স্যার। তবে প্রথমে আমি চাই আপনি আমার মোবাইলের এই ছবিটা দেখেন । ছবির খুঁটিনাটি মনে রাখার চেষ্টা করবেন।
-আচ্ছা । কিন্তু এটা কি। এতো খালি আঁকিবুকি।
-ভাল করে খেয়াল করুন স্যার।
-আশ্চর্য। ভিতরে পরিবর্তন হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
-স্যার এখন চোখ বন্ধ করুন। আপনি কিছু দেখতে পাচ্ছেন?
-কিছু বৃত্ত আর জ্যামিতিক প্যাটার্ণ। আর কিছু সংখ্যা। লেখাও আছে কিছু।
-আপনি আমাকে লেখাগুলো আর সংখ্যাগুলো বলুন।
-BB183368…………………….
রেজাউল করিম বলতে বলতে একসময় ঘুমিয়ে পড়েন। ছেলেটি হাতের মোবাইল নিয়ে বের হয়ে যায়। তার সাথে থাকে একগুচ্ছ তথ্য।
৪.
১৭/৮/২০২০
রেজাউল করিম বসে আছেন একদল পুলিশ অফিসারের সামনে। তিনি হতবিহ্বল হয়ে গিয়েছেন ঘটনার আকস্মিকতায়। একজন অফিসার তার সামনে এসে বসলেন।
-মি রেজাউল করিম, আমি জুনায়েদ খান। এসপি অফ ঢাকা ডিভিশন। আপনাকে কিছু প্রশ্ন করব। উত্তর দেবেন।
-আপনার ব্যাংক একাউন্ট সম্পর্কে ডিটেইলস কে কে জানতো?
-আমি আর আমার স্ত্রী । আর কেউ না।
-তাহলে আপনি আমাকে বলেন আপনার প্রতিটা ব্যাংক একাউন্ট প্লাস বাসার ডিজিটাল আলমারি থেকে সব টাকা কিভাবে চুরি গেল?
-আমি জানি না আসলে।
রেজাউল করিম খুব নার্ভাস অনুভব করেন।
-আপনার পিএস কোথায়?
-ও তো দেশের বাড়িতে গিয়েছে। ওর মা নাকি খুব অসুস্থ ।
-আচ্ছা ওর সাথে কনটাক্ট করার কোনো উপায় আছে?
-আমি বলতে পারবো না। ওর সম্পর্কে কিছু মনে নেই আমার।
জুনায়েদ খান হতাশায় মাথা নাড়লেন। এর কাছ থেকে কোনো সাহায্য পাওয়া যাবেনা তা তিনি বুঝতে পেরেছেন।
তিনি তার সার্চ টিমকে ডাকলেন। জিজ্ঞেস করলেন তারা কিছু পেয়েছে কিনা। তারা একটি বই তুলে দেন ওনার হাতে। ফিজিক্সের একটি বই। বইয়ের মালিকের নাম আর তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম দেয়া আছে। ঢাকা ইউনিভার্সিটি।
৫.
এক বছর আগে...
১৪/২/২০১৯
টিএসসি। অন্য সবার মত একটি ছেলে আর মেয়ে এসেছে আজকে ভালবাসা দিবস উৎযাপন করতে। তারা হাতে হাত ধরে হাঁটছে। ছেলেটি কিছু বলছে আর মেয়েটি তা শুনে হেসে ছেলেটির গায়ে ঢলে পড়ে।
-আচ্ছা রিশান, আজ তুমি আমাকে কিছু গিফট দিলে না কেন?
-তুমি কি নেবে তাই ভেবে কিছু আনিনি।
-এটা কোনো কথা বললে? তুমি কিছু আনবে আর আমি তা নেব না এটা কি করে হয়।
প্রেমা রাগ করে গাল ফুলায়। রিশান ওর গাল ফুলানো দেখে হেসে ফেলে।
-রাগলে তোমাকে অনেক কিউট দেখায় প্রেমা। হয়তো তোমার রাগ দেখেই একদিন তোমার পেমে পড়েছিলাম।
প্রেমা কোনো কথা বলে না। কিন্তু বেশিক্ষণ রাগ করেও থাকতে পারে না।
-রিশান জানো আমার না খুব ইচ্ছে করে তোমাকে খুব করে ভালবাসতে। আমি চাই সবাই যেন আমাদের প্রেমের কথা জানে । আমাদের প্রেমের গল্প মিথ হয়ে মানুষের মাঝে অমর হয়ে থাকে যেন।
রিশান প্রেমার কথা শুনে অবাক হয়ে তাকায়। ও লক্ষ্য করে কথাগুলো বলার সময় প্রেমার চোখ দুটো কেমন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
রিশান কিছু ভাবে। তারপর বলে
-আই লাভ ইউ প্রেমা। তুমি দেখো একদিন সবাই আমাদের প্রেমের গল্প মনে রাখবে। আমি কথা দিলাম। তবে আজকের মতো তোমার হাতটা দাও।
-হাত কেন?
রিশান কোনো কথা না বলে পকেট থেকে আংটি বের করে। তারপর প্রেমার হাতে পড়িয়ে দেয়। পাশে একদল ছেলে এটা খেয়াল করে। ওরা হাততালি দিয়ে প্রেমাকে অভিনন্দন জানায়।
৬.
১৮/৮/২০২০
জুনায়েদ খান নিজের অফিসে বসে আছেন। বর্তমান সময়ের ঘটা সবচেয়ে অবাস্তব(!) ঘটনা গুলো নিয়ে চিন্তা করছেন। আরও সাতটি চুরি। ঠিক একই পন্থায়। চোর প্রথমে পিএস হয়ে মি রেজাউল করিম সহ সাতজন বিশিষ্ট ধনী লোকের বাসায় ঢোকে। তাদের ব্যাংক একাউন্ট , বাসায় রাখা টাকা সম্পর্কে ডিটেইলস তথ্য নেয় । সে তথ্য গুলো নেয় হিপনোটাইজ করে । ফলে কারোই কিছু মনে থাকে না পরে। টাকা নিয়ে চোর স্রেফ বাতাসে উবে যায়। তার কোনো ট্রেস পাওয়া যায় না। সে শুধু টাকাই নেয়। সোনার গহনা বা অন্যান্য দামি জিনিস ছুঁয়েও দেখে না। কোনো ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেই, নেই কোনো সূত্র। গেটের সিসিটিভি ফুটেজেও অপরিচিত কাউকে পাওয়া যায় না পিএস ছেলেটা ছাড়া। সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং তথ্য হল চুরিগুলো সব একই দিনে একই সময়ে হয়েছে। প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশের বড় বড় ব্যাংক থেকে তোলা হয়েছে। আর চোরের কোনো সিঙ্গেল ক্লু ও নেই। তাকে টাকা তুলতে যেসব কর্মকর্তাগণ সাহায্য করেছিলেন তারা কেউই কিছু মনে করতে পারছে না। সব গুলো ক্যামেরা চেক করে দেখা হচ্ছে। আর তাতেই সবাই বিষম খাচ্ছে। একজন মানুষকেই আইডেন্টিফাই করতে পেরেছে তারা। ছেলেটি হল রিশান। একজন মানুষ একই সময় এত জায়গায় থাকে কিভাবে তারা তা বুঝতে পারছে না। আর রিশান খালি হাতেই ব্যাংকে ঢোকে আর খালি হাতেই বের হয়ে যায়। অন্তত সিসি ফুটেজ তাইই বলছে। জুনায়েদ খান খবর পেলেন রিশানকে ধরে আনা হয়েছে। তিনি রিশানের সাথে কথা বলতে চললেন। তার একটাই স্বস্তির বিষয় । মিডিয়া এখনও এ ব্যাপারে কোনো খোজ পায়নি।
৭.
রিশানকে একটি চেয়ারে বসিয়ে রাখা হচ্ছে। তাকে দেখে জুনায়েদ খানের মনে হল সে অস্বাভাবিক রকম স্বাভাবিক আছে। কারণ কাউকে পুলিশ কাস্টডি তে আনলে সে স্বভাবতই নার্ভাস হয়ে পড়ে।
-কিভাবে করলে তুমি এগুলো?
-কি করলাম স্যার? আমাকে এখানে আনা হয়েছে কেন?
-কি করলাম মানে! তুমি গতকাল কোথায় ছিলে সারাদিন?
-ফিজিক্স অলিম্পিয়েডে। কেন?
-এখানে প্রশ্ন করবো শুধু আমি। তুমি উত্তর দেখে খালি।
জুনায়েদ খান রাগ হতে থাকেন। আসলে তিনি মেনে নিতে পারছেন না রিশান এত শান্তভাবে তার সাথে কথা বলছে কিভাবে। তার উপর তাকে প্রশ্নও করছে।
-তুমি অলিম্পিয়াডে ছিলে না।
-হাসালেন স্যার। আপনি চাইলে ওদের সিসি ফুটেজ চেক করে দেখতে পারেন।
-ছেলেটা সত্যি কথাই বলছে স্যার।
পাশে থাকা তার জুনিয়র বলল।
-সে যদি একই সাথে সাত জায়গায় থাকতে পারে তবে আরেকটি জায়গায় থাকা তার জন্য কোনো ব্যাপার না।
যদিও কথাটা বললেন। তবু জুনায়েদ খানের বিশ্বাস হল না উনি বলেছেন এইমাত্র!
-কি যে বলেন স্যার। একটা মানুষ কিভাবে একসাথে এত জায়গায় থাকতে পারে? আমাদের কোয়ান্টাম ফিজিক্সে এটুকু বলা আছে একটি চার্জিত কণা একই সাথে দুইটি প্যারালাল ইউনিভার্সে থাকতে পারে। শুধুমাত্র কণা, স্যার। কোনো জলজ্যান্ত মানুষ নয়।
-তাহলে তুমি করলে কিভাবে?
-আচ্ছা স্যার, আপনি ফিকশনে বিশ্বাস করেন?
-ফিকশন? ইউ মিন ইল্যুশন? হোকাস পোকাস?
-অনেকটা ঐরকম। আপনি কিছু ফিকশন দেখবেন?
রিশানের মুখে এক চিলতে হাসি।
-ধরুন আমি আমার হাতটা এখানে ঢুকালাম আর বের করলাম আপনার সামনে।
বলতে বলতে রিশান করে দেখায়। আর সবাই বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে থাকে।
রিশান বাস্তব জগতের ক্ষেত্রের মধ্যে দিয়ে হাত ঢুকায় আর অপর এক জায়গা থেকে বের করে। সবার কাছে মনে হচ্ছে যেন রিশানের হাত কাটা পড়েছে আর সেই হাতটি অন্য আরেক জায়গায় স্রেফ ঝুলে আছে।
রিশান বলে
-এসব ফিকশন। এগুলো সম্ভব হয়েছে আমার স্বপ্ন তরঙ্গ সমীকরণের মধ্য দিয়ে। আমি এখন ইচ্ছে করলে অনেকরকম ফিকশনই বানাতে পারি।
-কেন করলে এসব, রিশান?
জুনায়েদ খান জিজ্ঞেস করেন।
-কি করবো স্যার। আমি একটি ভালোবাসার গল্প লিখতে চেয়েছি শুধু। রিশান হয়ে যা পারলাম না, মি ফিকশনিস্ট হয়ে করলে দোষ কি?
-যাই হোক স্যার। কিছক্ষণের মধ্যেই দুটো ট্রাক এসে যাবে। আপনারা কি আমাকে সাহায্য করবেন আমার লাভ স্টোরি লিখতে?
কাস্টডির সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মত মাথা নাড়ে।
৮.
১৯/৮/২০২০
বরিশালের রহমতপুরের এয়ারপোর্ট থেকে একটি প্লেন টেক অফ করে। গন্তব্য ঢাকা। প্লেনের যাত্রি শুধু রিশান আর প্রেমা। প্লেন উড়ে যাচ্ছে আর প্লেনের পিছন থেকে রাশি রাশি টাকা বের হয়ে বাতাসে ভেসে যাচ্ছে । আর প্রতিটি টাকায় ছোট ছোট করে লেখা “আই লাভ ইউ প্রেমা” ।
সমাপ্ত