লিগোয়েশন
১.
প্রফেসর ফারদিন হাসান তার ল্যাব কাম রিডিং রুমে স্টাডি টেবিলের সামনে বসে আছেন। ধ্যান করার ভঙ্গিতে বসলেও তিনি মাথা নাড়াচ্ছেন ক্ষণে ক্ষণে। তার মেজাজ প্রচুর খারাপ। কারণ হলো অনেক সময় ধরে একটা ধপ ধপ আওয়াজ তার চিন্তায় বাঁধা দিচ্ছে। স্টাডি টেবিলের উপর রাখা প্যাডে কিছু লিখে তিনি লেখাটি একবার পড়লেন। তারপর হঠাৎ করেই প্যাড থেকে যে পৃষ্ঠায় লিখেছিলেন ঐ পৃষ্ঠাটি ছিড়ে ময়লা ফেলার ঝুড়িতে ফেলে দিলেন।
-সুমি!
-হ্যাঁ বলো।
ফারদিন হাসানের ডাক শুনে রান্নাঘর থেকে জবাব দিলেন তার স্ত্রী।
-এতো শব্দ হচ্ছে কিসের?
-লিও বল খেলছে।
-ওকে বাইরে গিয়ে খেলতে বলো।
-বাইরে গিয়ে খেলা যাবে না।
-কেন?
-বাইরের পরিবেশ ভালো না।
-কিন্তু এভাবে তো কাজ করা যাচ্ছে না।
-তুমি একটু ওকে নিয়ে বাইরে যেতে পারো না? সারাদিনই তো ঘরে বসে থাকো। যাও এখন ওকে নিয়ে একটু পার্ক থেকে ঘুড়িয়ে আনো।
মিসেস সুমির কথা শুনে ফারদিন হাসান একটু সচকিত হলেন। আসলেই তো… অনেকদিন ধরেই তার ভার্সিটি আর বাসা ছাড়া কোথাও বের হননি। যে ইকুয়েশনটা মিলাতে পারছেন না সেটা বাইরে গিয়ে খোলা হাওয়ায় একটু বেড়ি্যে আসলে হয়তো ধরতে পারবেন। এই ভেবে লিওকে নিয়ে বের হয়ে পড়লেন প্রফেসর।
২.
লিওকে নিয়ে ফারদিন হাসান রাস্তায় হেঁটে বেড়াচ্ছেন। তার নির্দিষ্ট কোথাও যাওয়ার প্ল্যান নেই। লিও তার বাবার হাত ধরে আছে। মাঝে মধ্যে দুয়েকটা লাফ-ঝাপ ও দিচ্ছে। লিওর বয়স ৩ বছর। বয়স অল্প হলে কি হবে… এই ছেলে যা দেখে সব পুংখানুপুঙ্খ মনে রাখতে পারে। অপর দিকে ফারদিন হাসানের বয়স ৩৫ বছরের মতো হলেও তার ইদানিং অনেক কিছুই মনে থাকে না।
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে লিও তার বাবাকে বলল…
-আব্বু আইসক্রিম খাবো!
-আইসক্রিম? কোথায়?
-ঐযে ঐ দোকানে!
-আচ্ছা চলো। কোনটা খাবে?
-পুতুল আইসক্রিম খাবো।
ফারদিন হাসান লিওকে আইসক্রিম কিনে দিয়ে পাশে একটি ছোট পার্কে গেলেন। সেখানে একটি বেঞ্চে বসতে না বসতেই লিওর আরেক আবদার।
-আচ্ছা বাবা, আমাকে একটা লিগো কিনে দেবে যেটা দেখতে এই পুতুলটার মতো?
আইসক্রিম দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে লিও।
প্রফেসর আবার তার গবেষণা নিয়ে চিন্তা করছিলেন। তাই লিও কি বলছে প্রথমে বুঝতে পারেননি। তাই লিওকে আবার বলতে হলো তার আবদার।
-আচ্ছা দেবো কিনে। এখন তুমি খেল গিয়ে। আমি এখানে বসে আছি। বেশি দুষ্টামি করবে না।
যাকে বলা হয়েছে সে কি আর মানার লোক? একদৌড়ে সবার প্রথমে স্লাইডে উঠলো লিও।
এদিকে লিও নিজের অজান্তেই ফারদিন হাসানের মনে আশার আলো জাগিয়ে তুলেছে। লিগোর কথা শুনে ফারদিন হাসানের মাথায় নতুন ধারণার জন্ম নেয়। তিনি বুঝতে পেরেছেন যে কাজ তিনি কাগজে কলমে করতে পারবেন না সেখানে তাকে লিগোই সাহায্য করতে পারবে। তাই লিওকে খেলতে পাঠিয়ে নিজে চিন্তা করতে লাগলেন।
৩.
সংখ্যা! বড়ই রহস্যময় জিনিস। এই মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুকণায় সংখ্যার অস্তিত্ব আছে। আছে অনুপাত ও সমীকরণ। সংখ্যা ছাড়া আজ মানুষ একটা ক্ষুদ্র দিনও চলতে পারে না। জীবের প্রতিটি কোষ, অণু কোন জায়গায় কতোটি করে থাকবে আর তার অনুপাত কতো হবে তার উপর ভিত্তি করেই জীবের গাঠনিক ভিত্তি গড়ে উঠেছে। “ফি” এর অনুপাতের কথাই ধরা যাক। পৃথিবীর সব জীবের ক্ষেত্রে এই অনুপাতটি লক্ষ্য করা যায়। আরো রয়েছে কোষের অভ্যন্তরে এর প্রভাব। প্রতিটি কোষের ঝিল্লি সমান সংখ্যক গ্লাইকোলিপিড ও গ্লাইকোপ্রটিন অণুর সমন্বয়ে গঠিত। এই অনুপাত বা সমীকরণে কোনো পরিবর্তন আসে তাহলে সেই কোষ আর বাঁচতে পারে না।
তাহলে সংখ্যা বা সমীকরণ থেকে প্রাণ সৃষ্টি করা যাবে না কেন?
বসে বসে ফারদিন হাসান এসব কথাই ভাবছিলেন। মানুষ রোবট বানাতে পারলে সাইবর্গ বানাতে সমস্যা কোথায়?
লিওর খেলা শেষ করে তাকে নিয়ে বাসায় এসে কাজে বসে গেলেন ফারদিন হাসান। সারাদিন ইন্টারনেট ঘেটে আর নিজের যা জ্ঞান ছিলো তা কাজে লাগাতে শুরু করলেন।
লিওর পরের জন্মদিনে তিনি লিওকে একটি উপহার দেন, নড়াচড়া করতে পারা একটি লিগো। সবাই মনে করেছিলো লিগোটি বাজার থেকে কেনা ইলেকট্রনিক টয়। কিন্তু লিও লিগোটি মিলানোর পর বুঝতে পারলো এটা নতুন কিছু। কারন এই লিগোর মানুষটি শুধুমাত্র লিগো মিলানোর পরই নড়াচড়া করে।
এই লিগোটি ছিলো প্রফেসর ফারদিন হাসানের সফলতার প্রথম ধাপ। লিও লিগোতে মজা পেয়ে প্রায় সারাদিনই বাবার পাশে ঘুরঘুর করতো আর লিগোয়েশন প্রক্রিয়া দেখতো। হয়তো সবকিছু ঠিকঠাক ভাবেই চলতো যদিনা একটি রোড এক্সিডেন্টে ফারদিন হাসান মারা যান আর লিও মানুষের সমুদ্রে হারিয়ে যেত।
৪.
১৫ বছর পর।
সান্দ্রা প্রতিদিনই একটি ছেলেকে দেখতে পায় ওদের এলাকার লাইব্রেরীর আশেপাশে। প্রথম প্রথম মনে করতো ছেলেটা ওর পিছনে ঘোরে হয়তো। কিন্তু একদিন কলেজে যাওয়ার সময় বুঝতে পারলো ব্যাপার ভিন্ন। ছেলেটাকে দেখলো একটা বইয়ের দোকান থেকে জোর করে বের করে দেয়া হচ্ছে আর প্রচুর অপমান করা হচ্ছে। সান্দ্রা দেখলো ছেলেটা কোনো প্রতিবাদ করলো না। নীরবে ওর পাশ থেকে প্রস্থান করে। সান্দ্রার খুব কৌতুহল হয়। তাই দোকানের মালিকের কাছ থেকে জানলো ছেলেটার বই পড়ার খুব ইচ্ছা। প্রথম দিকে বাকি রেখে বই কিনতো। কিন্তু কতোদিন আর এভাবে দোকান চালানো যায়। তাই আজ বাধ্য হয়েই ওকে বের করে দিতে হয়েছে।
পরদিন সান্দ্রা লাইব্রেরীতে বসে আড়চোখে ছেলেটাকে দেখতে লাগলো। সস্তা জিনসের প্যান্ট আর একটা নোংরা টি-শার্ট পড়নে, যা লাইব্রেরীর পরিবেশের সাথে অত্যন্ত বেমানান। সান্দ্রা ঠিক করলো আজ ছেলেটার সাথে কথা বলবে। ছেলে যেই লাইব্রেরী থেকে বের হয়ে রাস্তায় নামলো অমনি পিছন থেকে সান্দ্রা ডাক দিলো
-এই যে, শুনছেন?
ছেলেটা ঘুরে তাকিয়ে আশপাশে দেখলো কথাটা ওকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে কিনা।
তারপর কথা না বলে দাঁড়িয়ে রইলো। সান্দ্রা কাছে গিয়ে বলল
-আপনার নামটা জানতে পারি?
-কেন?
-আসলে অনেকদিন ধরেই আপনাকে প্রতিদিন লাইব্রেরীতে আসতে দেখছি। আমিও আসি। তাই ভাবলাম পরিচিত হয়ে নেই।
-ও আচ্ছা।
-তো আপনার নামটা?
-লিও।
-ওহ! নামটা একটা বিখ্যাত ক্যারেক্টার এর। জানেন?
-হেনরি রাইডার এর “শী” বইয়ে আছে।
-ওমা! জানেন দেখি। বাই দা ওয়ে আমি সান্দ্রা। কিসে পড়েন?
-গ্যারেজে কাজ করি।
সান্দ্রা এরকম একটা উত্তর আশা করেনি। ছেলেটা শুরু থেকেই কেমন যেন চাঁপা স্বভাবের।
-আমি মহিলা কলেজে ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি।
সান্দ্রা সেধে নিজে থেকেই সব বলে যাচ্ছে। আর লিও অবাক হয়ে তার কান্ডকারখানা দেখছে।
-ইয়ে মানে আমার কাজ আছে। যেতে হবে।
-ওহ। আহ! স্যরি। নাইস টু মিট ইউ। কালকে দেখা হবে।
-আচ্ছা। (না হলেই ভালো হয়!) লিও মনে মনে বললো।
৫.
সান্দ্রার ঐদিন রাতে ঘুমানোর আগে আবার লিওর কথা মনে পড়লো। ছেলেটার ভিতরে কি যেন একটা আছে। অনেক প্রাণশক্তিতে ভরা একজন যুবক। গ্যারেজে কাজ করলেও কথাবার্তা পুরোই স্মার্ট ধরণের। আর সে লাইব্রেরীতে গিয়ে বইও পড়ে! সচেতন মানুষ। এসব ভাবতে ভাবতে সান্দ্রা ঘুমিয়ে পড়ে।
পরদিন লাইব্রেরীতে যাওয়ার আগে লিওর জন্য জীবনানন্দ দাশের কবিতা সমগ্র বইটা কিনে নিলো। আসলে যারা বই পড়ে (বিশেষ করে লিওর মতো কষ্ট করে বই পড়ে) তাদের জন্য সান্দ্রার আলাদা একটা মায়া কাজ করে। ছোটবেলা থেকে বাবার আদরে মানুষ হলেও অন্য মানুষের অনুভূতি সে ভালোভাবেই অনুভব করতে পারে।
লিও বই পেয়ে জিজ্ঞেস করলো
-এটা কিসের জন্য?
-ইয়ে ঐদিন আপনাকে বইয়ের দোকানে দেখেছিলাম বইটার জন্য।
-ওহ!
লিওর মনে পড়ে গেল দোকানদারের ব্যবহার। তার চেয়ে বেশি অবাক হলো সান্দ্রার কার্যক্রমে। কোথাকার কোন ভদ্র পরিবারের মেয়ে এসে ওর মতো ছেলের সাথে নিজে থেকে পরিচিত হল। আজ দেখি আবার বইও গিফট করছে। কাহিনী কি?
-স্যরি। আমি আপনার উপহার নিতে পারবো না। আমাকে মাফ করবেন। বলেই লিও চলে গেল।
এদিকে সান্দ্রার মন খুব খারাপ হয়ে গিয়েছে। সে খুব জেদী মেয়ে। আজ পর্যন্ত তাকে না করেছে এমন লোকের সংখ্যা খুব কম।
কাল শুক্রবার। লাইব্রেরী বন্ধ।
তাই সে লিওর গ্যারেজে যাবে বলে ঠিক করলো।
৬.
সান্দ্রা পনেরো মিনিট হলো লিওর জন্য বসে আছে খোকার গ্যারেজে। গ্যারেজের মালিক তার খাতির করার কোনো ত্রুটি রাখেনি। কারণ তার গ্যারেজে এই প্রথম কোনো বড় লোকের মেয়ে গাড়ি নিয়ে এসেছে। কিন্তু পরে জানতে পারলো সে এসেছে লিওর জন্য।
লিও আসতে দেরী করছে। এদিকে গ্যারেজের মালিক, হানিফ মিয়া চিন্তায় পড়লেন। লিও কোনো সমস্যা করেনি তো। তাই নতুন ম্যাডামের সামনে লিওর গুণগাণ করা শুরু করলেন।
-বুঝলেন ম্যাডাম, লিওর মতো ছেলে হয় না। ও একা পুরো একটা গাড়ি খুলে আগের মতো জোড়া লাগিয়ে দিতে পারে। যা দেখে সব মনে থাকে ওর। এইতো সেদিন একটা অনেক মূল্যাবান গাড়ির পার্টস নষ্ট হওয়ার পথে ছিলো। কেউ ধরতে সাহস পাচ্ছিলো না। ও ম্যানুয়েলটা একবার পড়েই ঠিক করে দিয়েছে।
-ও কতোদূর পর্যন্ত পড়েছে?
সান্দ্রা জিজ্ঞেস করল।
-তা তো জানি না ম্যাডাম।
-ও আচ্ছা।
এরপর সান্দ্রা লিও সম্পর্কে অনেক কিছুই শুনতে লাগলো হানিফ মিয়ার কাছ থেকে।
আজ লিওর গ্যারেজে যেতে দেরী হচ্ছে। কারন সকালে গ্যারেজে যাওয়ার পথে ও এক মহিলাকে কিছু খেলনা বিক্রি করতে দেখলো। ওর মনে পড়লো গ্যারেজের মালিক হানিফ মিয়ার ছেলের জন্মদিন আজকে। সেই উপলক্ষে গ্যারেজের সবাইকে নিজের বাসায় দাওয়াত দিয়েছেন তিনি। তার ছেলের জন্য নিজের সাধ্যের মধ্যে একটা খেলনা কেনার চিন্তা করলো।
তাই ঐ মহিলার কাছে গিয়ে লিও খেলনা খুঁজতে লাগলো। বোরকা পড়া মহিলা তার সামনে একটা কাপড় বিছিয়ে খেলনা বিক্রি করছে। সবগুলোই লিগো। লিও একটা বেছে নিয়ে দাম জিজ্ঞেস করলো। তাকে অবাক করে দিয়ে মহিলা অনেক কম দাম বললেন। দাম দিয়ে এতো কম দামের কারণ জিজ্ঞাসা করাতে মহিলা বললেন এগুলো কেউ কিনতে চায় না। কারণ মিলাতেই পারে না কেউ। শুনে লিও খানিকটা অবাক হয়। কেনার পরে এই কথা শুনে তার নিজের কৌতুহল হয়। তাই লিও গ্যারেজে না গিয়ে নিজের মেসে চলে যায় লিগোটা মিলানোর জন্য।
৭.
লিও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে লিগোটার দিকে। তার যতদূর মনে আছে এরকম একটা লিগোমানব তার ছিল। আরো অবাক হওয়ার ব্যাপার এতো সহজ লিগো সেট কেউ মিলাতে পারেনি বলে।
কিন্তু লিগোটায় একটু খুত আছে মনে হল লিওর কাছে। একটি বিশেষ প্যাটার্ন দেয়া যেতে পারে। এই ভেবে সে লিগোটাকে খুলে নতুনভাবে সাজালো। প্রতিটি পিস যেন একটা করে সংখ্যার মত। আর লিগোমানবটি হল তার সমীকরণ। এসব ভাবতে ভাবতে লিও গ্যারেজে চলে যায়। মালিকের ছেলের জন্য কিছু চকলেট কিনে নেয় ও।
গিয়ে দেখে সান্দ্রা বসে আছে ওর অপেক্ষায়।
-কি জ্বালা! মনে মনে বললো লিও।
সান্দ্রা মেয়ে হিসেবে যথেষ্ট সুন্দরী। তার আকাশী ফ্রেমের চশমাটা তার সৌন্দর্য যেন আরো বাড়িয়ে তুলেছে। এগুলো গতদুইদিন বা তার আগে খেয়াল করেনি লিও। ওর কাজই হলো গ্যারেজে কাজ করে নিজের পেট চালানো আর বই পড়ে মন চালানো! মেয়েদের দিকে তার আকর্ষণ আগে কখনোই ছিল না। আজ যেন তা নতুন করে জন্ম নিল।
সান্দ্রা ওকে নিয়ে বাইরে একটা রেস্টুরেন্টে বসে। লিও চুপচাপ বসে আছে দেখে সান্দ্রা নিজেই কথা বলা শুরু করে। অনেক প্রশ্ন করার পর জানতে পারলো লিওর কাহিনী।
সেই এক্সিডেন্টে হারিয়ে যাওয়ার সময় একটা বাসে ছিলো লিও। ফারদিন হাসান খাবার কিনতে নিচে গিয়েছিলেন। কিন্তু এক্সিডেন্টে সে মারা যাওয়ায় আর তার বাসে ওঠা হয়নি। আর এদিকে লিও চলে যায় সম্পূর্ন অচেনা অজানা এক জায়গায়। সারাদিন না খেতে পেরে সে আশ্রয় পায় হানিফ মিয়ার গ্যারেজে। ও আর ওর মায়ের কাছে ফিরে যেতে পারে না। হানিফ মিয়া যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পরে জানতে পারা যায় লিওর মা, সুমি হাসানকে প্রতিবেশিরা মামলা করে ঐ বাসা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। লাভ ম্যারেজ ছিল বলে নিজের বাসা থেকে কোনো সাহায্য পাননি মিসেস হাসান। তিনি কোথায় চলে গেছেন কেউ বলতে পারে না। তাই লিওকে নিজের কাছে রাখেন হানিফ মিয়া। এখনো ওখানেই আছে ।
লিওর কাহিনী শুনে সান্দ্রার চোখে পানি এসে গেল। সে বুঝতে পারলো লিও বড় ঘরের ছেলে। আর সে লিওকে কথা দিলো ওর মাকে খুঁজে বের করতে সাহায্য করবে। কারণ সান্দ্রা গতরাতেই বুঝতে পেরেছিলো সে লিওর প্রেমে পড়েছে!
৮.
লিও সেইদিন রাতে মেসে ফিরলো জীবনানন্দ দাশের কবিতা সমগ্র হাতে। রুমের আলো জ্বালাতেই সে একটা বিস্ময়ের ধাক্কা খায়। লিগোমানবটিকে সে যেখানে রেখে গিয়েছিলো সেটা সেখানে নেই। কিছুদূরে আছে আর অবাক করার ব্যাপারটি হলো সেটি নড়াচড়া করছে, সোজা কথায় বলা যায় হাঁটাচলা করছে।
লিওকে দেখে লিগোমানবটি দৌড়ে ওর কাছে আসে। লিও প্রবৃত্তির বশেই খানিকটা পিছিয়ে যায়। কিন্তু লিগোমানবটি ওর আরো কাছে এসে পড়ে। তারপর ওর জামা(প্যান্ট) ধরে টানতে থাকে। লিও বিস্ময় কাটিয়ে উঠতে পারে না। সে বুঝতে পারে লিগোমানবটি তাকে কোথাও নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু আকারে অনেক ছোট বলে নিতে পারছে না। লিও দরজায় তালা মেরে লিগোমানবটির পিছনে পিছনে চলতে থাকে। রাত তখন একটা বাজে বলে রাস্তায় মানুষ নেই বললেই চলে। তাই এই দুই জনের অদ্ভুত দলটিকে কেউ দেখতে পেল না।
লিগোমানবটি লিওকে একটি বাসার সামনে নিয়ে যায়। বাসাটি ছিলো শহরের একটি বস্তির খুব কাছেই। লিওকে বাসাটির ভিতরে ঢুকাতে চেষ্টা করে লিগোমানবটি। কিন্তু লিও জানালায় আলো দেখে ওখানে উকি দেয়। ভিতরের মানুষটিকে দেখে তার চোখ থেকে অঝোর ধারায় অশ্রু বর্ষন হতে থাকে। চেহারায় বার্ধক্যের ছাপ পড়লেও নিজের মার চেহারা চিনতে ভুল হয়নি লিওর। মিসেস হাসান তখন আপন মনে তার আগামী দিনের বিক্রির জন্য লিগোগুলোকে মুছে রাখছিলেন। তার স্বামীর এককালের কাজের জিনিস আজ তার জীবিকা অর্জন করতে সাহায্য করছে!
পরের কাহিনী সংক্ষিপ্ত। লিগোমানবের কারণে লিও তার মাকে ফিরে পায়। আর সান্দ্রার সাহায্যে সে পড়ালেখা শেষ করে আজ পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীতে পরিণত হয় লিগোয়েশন এর মাধ্যমে। সান্দ্রাও তার প্রথম প্রেমের মানুষটিকে স্বামী হিসেবে পায়।
লিও নিজের অজান্তেই ফারদিন হাসানের অসমাপ্ত কাজ লিগোয়েশন এর সাহায্যে নিম্নবুদ্ধিমত্তার প্রাণ সৃষ্টি করতে পেরেছিল। কিন্তু ঠিক কি কারণে লিগোমানবটি লিওকে সাহায্য করেছিলো আর কিভাবে করেছিলো তা জানা যায়নি।
আজ লিগোয়েশন মেথড এর তৃতীয় প্রজন্মের লিগোমানবদের হাতে মানব সম্প্রদায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। এর জন্য ফারদিন হাসান নাকি লিওকে, ঠিক কাকে দায়ী করা করা হবে সেটি জানার জন্য একটি মানুষও বেঁচে নেই। প্রকৃতি চায় না প্রাণ সৃষ্টি করার মত ক্ষমতা তারই সৃষ্টি পেয়ে যাক। তাই মানুষের বিলুপ্তি হয়ে আজ পৃথিবীতে বসবাস করছে লিগোমানবরা। যাদের বুদ্ধিমত্তা মানুষের সমপর্যায়ের। লিগোয়েশন মেথড কালের গর্ভে হারিয়ে যায়। তবে চতুর্থ প্রজন্মের লিগোমানবেরা মনে করে মানবজাতির বিনাসের হোথা ছিল লিও যে নতুন প্যাটার্নে লিগোয়েশন সাজাতে যেয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়েছিলো লিগোমানবদের!
সমাপ্ত।