Yusha Abdullah logo
  • Home
  • CV
  • Blog
  • Writings
  • Achievements
  • Publications
  • Contact
Yusha Abdullah logo

© 2026. All rights reserved.

Writings
লাল চোখের মায়াবতী
Story

লাল চোখের মায়াবতী

2014-10-30
১. আজ আমার ঘর ছাড়ার ১০ বছর পূর্ণ হলো। আমি আরিয়ান। হয়তো আর সাধারণ কয়েকটা ছেলের মতই আমার এখন পড়াশুনা শেষ করে ব্যাবসা বা কোথাও জব করার কথা ছিল। কিন্তু কিছু পারিবারিক গোলযোগ আর নিজের ভ্রমণ-অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়তার কারণেই আমি একরাতে ঝোঁকের মাথায় ঘর ছেড়েছিলাম। আর ঘরে ফেরা হয়নি। আজ ১০ বছর হয়ে গেল আমি আমার পরিবার থেকে দূরে আছি। আমি ছাত্র হয়তো খারাপ ছিলাম না। নিজের পড়াশুনার পাশাপাশি আমি বাইরের বই পড়তাম প্রচুর। তার ব্যবহার করেই আজ আমি পথ চলছি আর নিজের পেট পূজোর ব্যাবস্থা করছি। গত দশ বছরে আমি বাংলাদেশের অনেক জায়গায়ই ঘুড়ে বেড়িয়েছি। এবার আমার ইচ্ছে ছিলো কক্সবাজার জেলায় যাবো। আমার কাছে সেখানে যাবার মত পর্যাপ্ত টাকা আমার কাছে ছিল না। কিন্তু আকস্মিক এক ঘটনায় আমার নিয়তি বদলে গেল। আমি তখন ঢাকায় ছিলাম। এক রাতে আমি হোটেল থেকে খেয়ে আমার থাকার জায়গায় ফিরছিলাম। রাত্র তখন প্রায় ১ টা বাজে। রাস্তাটা ছিলো ঢাকা টু ময়মনসিংহ হাইওয়ে। আমি সেখানে একটা প্রাইভেট কারের সাথে একটা মালবাহী ট্রাকের সংঘর্ষ হয়। প্রাইভেট কারটার সামনের অংশ অনেকখানি দুমরে মুচড়ে যায়। আর ট্রাক ড্রাইভার ট্রাক নিয়ে পালিয়ে যায়। হাইওয়ে বলে আর মাঝরাতে নিজের বিপদ না বাড়ানোর জন্য কেউ হয়তো গাড়ি থামাচ্ছিলো না। আমি কাছে এগিয়ে গেলাম। সামনে বসা ড্রাইভার চাঁপা খেয়ে পুরো থেৎলে গিয়েছে। পিছনে মাত্র একজন মানুষ বসা। তারও অবস্থা গুরুতর। আমি কোনোমতে একটা গাড়ি ম্যানেজ করে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। তার জ্ঞান আসলে সে আমাকে তাকে বাঁচানোর জন্য উপহার দিতে চায়। সে ঢাকার একজন বড় ব্যাবসায়ি। সে আমাকে কাছে ডেকে আমার জীবন সম্পর্কে জানতে চাইলো। প্রথমে না বললেও পরে আমি তাকে আমার সম্পর্কে বলি। আমার ভবঘুরে জীবন দেখে তিনি আমাকে একটা ব্যাংক একাউন্ট খুলে তাতে অনেক টাকা দিয়ে দেন। আমি হাজারবার টাকা নিতে প্রত্যাখ্যান করলেও তিনি আমার কথা শুনলেন না। তার জীবন বাঁচানোর জন্য আমাকে এই ছোট্ট উপহার দিতে চান। নাহলে তিনি খুব রাগ করবেন বললেন। তাই বাধ্য হয়েই আমাকে টাকাটা নিতে হয়। আজ সেই টাকা দিয়েই আমি আমার ইচ্ছা অর্থাৎ কক্সবাজার এর টিকেট কেটে বাসে উঠে পড়লাম। -আহ! কি শান্তি! আমি এখন একটা টিলা এর উপর বসে সমুদ্র দেখছি। এর আগে যদিও আমি কুয়াকাটায় সমুদ্র দেখেছি কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সমুদ্র সৈকতে বসে বে অফ বেঙ্গল দেখার মজাই আলাদা। ঘড়িতে প্রায় ৯ টা বাজে। ঘুম থেকেই উঠে আমি সাগর পাড়ে চলে এসেছি। দিনের শুরুটা সাগর দেখে শুরু করলে মন্দ হয় না। আমি লাবণি পয়েন্টে আছি এখন। নাস্তা করার জন্য একটা মোটামুটি গোছের হোটেলে ঢুকলাম। চা খেলাম আর পরোটা। এখানকার মানুষ ভাজিতে ঝাল মনে হয় একটু বেশিই খায়। মুখে দিয়ে মনে হলো আগুন ধরে গেছে। তারাতারি একগ্লাস দুধ খেলাম। দুধ মরিচের ফেনলকে প্রশমিত করে ঝাল কমিয়ে দেয়। তারপর কোনমতে চা দিয়ে নাস্তা সেরে আমি বাইরে বের হয়ে আসলাম। ২. লাবণি পয়েন্ট থেকে আমি আমার হোটেলের দিকে ফিরতেছিলাম। কক্সবাজার বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ট্যুরিজম প্লেস হলেও এর কিছু কিছু রাস্তা বা জায়গা দিনের বেলা অনেকটাই নির্জন থাকে। যেমন আমি এখন যে রাস্তাটায় হাটছি তা অনেকটাই নির্জন। রাস্তার একপাশে ছোটখাটো জঙ্গল আরেকপাশে সাগর। কিছুদূর যাওয়ার পর জঙ্গলের ভিতরে একটা সরু রাস্তা দেখতে পেলাম। রাস্তাটা ছাড়িয়ে যেই কিছুটা সামনে এগিয়েছি অমনি পিছন থেকে কিছু অপ্রত্যাশিত আওয়াজ পেলাম। ঘুরে দাঁড়াতেই দেখলাম তিনটা ছেলে একটা মেয়েকে টেনে হিচড়ে নিয়ে যাচ্ছে আর মেয়েটা চোখ বন্ধ করে চিৎকার করতেছে। পিছনে একজন বুড়ো মানুষ ছেলেগুলোর কাছে কিছু বলছে বা অনুনয় করছে বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু ছেলে তিনটা দেখতে গুন্ডা ধরণের। পরণে সাধারণ বাঙ্গালি পোশাক, মানে গেঞ্জি আর লুঙ্গি। তারা মেয়েটাকে জোর করে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। -হুম! সমস্যা গুরুতর। আমি আপন মনে ভাবলাম। তারপর সাহায্যের আশায় এদিক সেদিক তাকালাম। কিন্তু কাউকে দেখতে না পেয়ে নিজেই এগিয়ে গেলাম। আসলে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে আমার কোনো পিছুটান নেই। তাই নিজের মনের মত থাকি আর সবাইকে যথাসাধ্য সাহায্য করতে চেষ্টা করি। -এই যে ভাই, শুনছেন! কি হচ্ছে এখানে? ছেলে তিনটা থমকে দাঁড়ালো। একমূহূর্ত যেন তিনজোড়া চোখ আমাকে স্ক্যান করে নিলো। মেয়েটা আগের মতই চোখ বন্ধ করে আছে কিন্তু চিৎকার থামিয়ে দিয়েছে। আর বুড়ো লোকটা হাঁপাতে হাঁপাতে আমাদের পাশে এসে থামলো। যে ছেলেটাকে দেখে নেতা গোছের মনে হলো সে বলল -কিছু না। -কিছু না হলে মেয়েটাকে এভাবে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন কেন? -তাতে তোর কি? -আমার কিছুই না। জাস্ট কিউরিওসিটি। -মানে কি? -মানে বললাম যে কৌতুহল হল তাই জিজ্ঞেস করলাম। ছেলেটা মনে হয় ইংরেজী বোঝে না। -বেশি কৌতুহল দেখায়েন না। বুঝলাম এদের কাছ থেকে কিছু জানার আশা নেই। তাই বুড়ো লোকটার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলাম -চাচা কি হয়েছে? -বাবা, ওরা আমার মাইয়াটাকে জোর করে তুইলে নিয়ে যাচ্ছে। বলতে বলতে বৃদ্ধের চোখে পানি দেখা গেল। -কেন? -মাছ ধরার চাঁদা সময় মত দিতে পারি নাই বাবা। -এটা কেমন কথা? বলতে বলতে আমি ছেলেগুলোর দিকে ফিরলাম। পথ আগলে রেখেছিলাম বলে ওরা যেতে পারতেছিল না। -দ্যাখ, তুই বড় পেঁচাল পারতেছিস। রাস্তা থেকে সরে যা। একজনে বলল। -উহুঁ! এভাবে তো আপনারা মেয়েটাকে ধরে নিতে পারেন না। -এই মেয়েটা আমাদের। কি করবি তুই? বলেই একটা ছেলে সামনে এগিয়ে এসে আমাকে খুব জোরে ধাক্কা মারলো। আমি ছিটকে পড়লাম মাটির উপর। এতক্ষণ তুই করে বলেছে তারপরও কিছু বলিনি। কিন্তু গায়ে হাত দিতেই দুম করে মাথার ভিতর আগুন ধরে গেলো। উঠে দাঁড়িয়ে গায়ের ময়লা ঝাড়লাম। তারপর যে ছেলেটা আমাকে ধাক্কা দিয়েছে ওর মুখে পরপর দুইটা ঘুসি চালিয়ে খুব জোরে থুতনির নিচে একটা আপার কাট মারলাম খুব ক্ষিপ্রতার সাথে। ছোটবেলায় কারাতে শিখেছিলাম। তার খানিকটা এখন জীবনে প্রথমবার প্রয়োগ করলাম। আপার কাট খেয়ে ছেলেটা দুই-তিন হাত দূরে ছিটকে পড়লো। ওর মুখ থেকে গলগল করে রক্ত বের হয়ে আসলো। ছেলেটা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে মুখ চেপে ধরে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এটা দেখে বাকি দুইজন মেয়েটাকে ছেড়ে দিয়ে আমাকে মারতে আসলো। আমি তাড়াতাড়ি কাধের ব্যাগটা খুলে একজনের মুখ বরাবর ছুড়ে মারলাম আর আরেকজনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। তার মুখেও এলোপাথারি মারতে লাগলাম। সে চোখে একটা গুতা খেয়ে চোখ চেপে বসে পড়লো। নাকটাও মনে হয় ভেঙ্গে গেছে। হঠাৎ পিছন থেকে কে যেন শক্ত কিছু দিয়ে আমার মাথায় আঘাত করলো। আমার চোখের সামনেটা অন্ধকার হয়ে গেলো। কোনমতে পিছনে ফিরতেই দেখলাম যে ছেলেটাকে ব্যাগ মেরেছিলাম ও একটা পাথর হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ব্যাথায় আমি মুখ কুঁচকে ফেললাম। তারপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই কোমরের লুঙ্গির ভাজ থেকে একটা ফোল্ডিং নাইফ বের করে আমার বুকের ডান দিকে বসিয়ে দিলো। তীক্ষ্ম একটা ব্যাথা যেন শরীরের প্রতিটি লোমকূপে ছড়িয়ে পড়লো। আমার চোখ থেকে পানি বের হয়ে গেল। আমি মাটির উপর বসে পড়লাম। বুকের হাড্ডি ভেদ করে ছুড়ির ফলাটা ঢুকে গিয়েছে। হ্যাচকা টানে বের করে আনলাম। মনে হল বুকের ভিতর থেকে গরম কোন অঙ্গার বের করে ফেলা হয়েছে। রক্ত বের হয়ে আমার হাত আর সাদা শার্ট ভিজে লাল হয়ে গেল। ভাবতেও পারিনি এত অল্পতে কেউ ছুড়ি বের করবে। আমার চারদিক ঘুরতে লাগলো আর কষ্টে আমার চেতনা হারাতে লাগলাম। তার ভিতর হালকা ভাবে দেখতে পেলাম ছেলে তিনটা পালাচ্ছে মেয়েটাকে রেখে। আর পারলাম না। চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল। ৩. কি হচ্ছে কিছু বুঝতে পারতেছি না। মনে হলো চারদিক দুলছে আর আমার ভীষণ বমি পাচ্ছে। আমার বুকের উপর কারো হাতের স্পর্শ অনুভব করলাম। বুকের কাছে খুব জ্বলতেছে। হঠাৎ বুকের ডানদিকটায় কেমন যেন গরম অনুভূত হলো। অদ্ভুত অনুভূতি। ব্যাথার চোটে আমি আর্তনাদ করে উঠলাম। ধীরে ধীরে ব্যাথাটা কমে আরামদায়ক এক উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়লো। হাতটা এখনো আমার বুকের উপর আছে। আমি চোখ খুলে তাকালাম। চারদিকে অন্ধকার। না, একটু হলদে আলো দেখা যাচ্ছে। একটু পাশে তাকাতেই ভয়ানকভাবে চমকে উঠলাম। একটা অপূর্ব সুন্দরি মেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার চমকে ওঠার কারণ হল মেয়েটার চোখের মণি দুইটা লাল বর্ণের। সাধারণত এলবিনোদের এমন লাল রঙের আইরিস থাকে। আর সবচেয়ে আশ্চর্য বেপার হল মেয়েটা আমার বুকে হাত দিয়ে আছে আর আমার ব্যাথাও অনেকটা কমে গেছে। মেয়েটা আমার চেয়ে বয়সে ১/২ বছরের ছোট। আমাকে চোখ খুলতে দেখে মেয়েটা তারাতারি ওর হাতটা সরিয়ে নিল আর আবার তীব্র ব্যাথা আমাকে গ্রাস করলো। আমি অনেক কষ্টে দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করার ব্যার্থ চেষ্টা করলাম। পারলাম না। বুক চেপে ধরে ককিয়ে উঠলাম। দেখলাম মেয়েটা একবার ইতস্তত করে আমার হাতটা সরিয়ে বুকের উপর ওর হাতটা আলতো করে রাখলো। আবার সেই অনুভূতি। মনে হলো বুকের খোলা জায়গাটায় আস্তে আস্তে গরম হয়ে যাচ্ছে আর ব্যাথাটা কমে যাচ্ছে। মেয়েটাকে বাঁধা দেবার শক্তি আমার গায়ে নেই। তাই ও যা করতেছে আমি বিস্ফোরিত চোখে তা দেখে যাচ্ছি। প্রায় মিনিট পনেরো পর আস্তে করে হাত সরিয়ে নিলো লাল চোখের মায়াবতীটা। হুম… আমি মনে মনে ওকে এই নামটাই দিয়েছি। চেহারা আর দশটা সাধারণ বাঙ্গালি সুন্দরিদের মতো। কমলা রঙের শারিতে অগ্নিকন্যার মত লাগছে। ও সেই মেয়েটাই যার জন্য আমার এ অবস্থা। আমি বুঝেছি যে আমরা একটা নৌকায় আছি। তাই খালি দুলুনি হচ্ছে। আর হলুদ আলোটা একটা হারিকেন থেকে আসছে। সেই প্রথম কথা শুরু করলো… -আপনার ব্যাথা কমেছে? কন্ঠ শুনে বুকে ধাক্কা লাগলো। এমন মিস্টি গলা আমি আগে কখনো শুনিনি। -হুম। কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব? -জানি না। এই জাউটুকু খেয়ে নিন। ভালো লাগবে। -আমার ব্যাগ? -আছে রাখা ওখানে। বলেই আমাকে উঠে বসতে সাহায্য করলো। আমি কোনোমতে বসে নৌকার দেয়ালে হেলান দিলাম। তারপর ওকে বললাম… -ইয়ে মানে… তোমার নামটা? -শ্রাবনী। বলেই মেয়েটা আলো থেকে দূরে একটু অন্ধকারে গিয়ে বসলো। মেয়েটা কথা মনে হয় কম বলে। তাই আমি আর কিছু না বলে বাটি থেকে জাউ খেতে শুরু করলাম। লবণ কম হয়েছে। যাই হোক। খুব ক্ষুধা লেগেছিলো। তাই খেতে থাকলাম। ৪. আমার বুকে যে গর্তের সৃষ্টি হয়েছিলো তা আশ্চর্যজনকভাবে মিলে গিয়েছে। অল্প অল্প ব্যাথা হয় কিন্তু ক্ষতটা আর নেই। আর ব্যাথা আছে মাথার পিছনে যেখানে পাথর দিয়ে আমাকে আঘাত করা হয়েছিলো। কিন্তু ওকে আর সে ব্যাপারে বললাম না। আমি অবাক হলাম যে শুধু হাতের ছোঁয়া দিয়ে মানুষকে এভাবে আরোগ্য করা দেখে। এরকম হিলিং পাওয়ার আমি একবার পেপারে পড়েছিলাম। চীনে নাকি মানুষ সাধনার মাধ্যমে এরকম করতে পারে। চীনের ওয়াং গুয়াং নামক জায়গায় মানুষ “চী” শক্তি নামের একপ্রকার দৈব শক্তির সাধনা করে যা তাদের নিজেদের হিলিং করার ক্ষমতা দেয়। তারা অন্যদের মধ্যেও এ শক্তির সঞ্চালন করতে পারে। কিন্তু শ্রাবনী এর সাধনা করতে যাবে কেন! আমাকে এর রহস্য জানতেই হবে। খাওয়া শেষ করে বসতেই বুড়ো লোকটা (সম্ভবত শ্রাবনীর বাবা) আসলেন। হাতে একটা বাজারের ব্যাগ। আমাকে বসে থাকতে দেখে বললেন -বাবা, ব্যাথা কমেছে? -জী চাচা। কিন্তু এখানে কি হচ্ছে আমাকে একটু খুলে বলবেন? আমি এখানে আসলাম কিভাবে? উনি একটা গামছা দিয়ে মুখ মুছে বললেন -তোমাকে ওরা মাইরা ফেলে পালাইয়া গেছিলো। আমি তখন একটা আদিবাসী ছেলেরে নিয়া তোমাকে এই নৌকায় আইনা রাখছি। আর বাড়ি বেঁইচা দিয়া এই নৌকাটা খরিদ করেছি। কারণ ওরা আবার আসতো আমাদের ঐখানে। তাই বাধ্য হইয়া এই ছোট্ট বজরায় উইঠাই পালাইছি। আর শোন বাবা, ওরা খুব খারাপ লোক। তোমাকে ওরা আর বাঁচতে দিতো না। তুমি আমার মেয়ের ইজ্জত-জান বাঁচাইছো। তোমার এই উপকার আমরা কিছু দিয়াই মিটাইতে পারতাম না। তাই এখন তোমাকে সাথে নিয়াই চইলা আসছি। -ওহ আচ্ছা! তা আমরা এখন আছি কোথায়? -বাঁশখালী বাজারে। আমরা সাগর দিয়া আসছি। -যাবেন কোথায়? -দেখি। আল্লাহ যেইখানে নেয়। আপাতত হাতিয়ার দিকে যাব। তা বাবা তোমার পরিচয়? আমি আমার সম্পর্কে বৃদ্ধকে খুলে বললাম। সব শুনে তিনি কেমন যেন গম্ভির হয়ে গেলেন। আমি তাকে বললাম -চাচা, শ্রাবনীর কি হয়েছে? ও এটা কিভাবে করলো? -বলবো বাবা। সবই বলবো। তুমি এখন একটু শুইয়া থাকো। আমি যাই নৌকার পাল নামায়ে দেই। এই এলাকা ছাড়তে হইবে আগে। ৫. আমরা রাতের আধারে মেঘনা নদীর মোহনা পাড়ি দিতেছি। আপাতত গন্তব্য হাতিয়া দ্বীপ। আমি একটা ভারী জামা পড়ে নৌকার গলুইয়ে বসে চাচার সাথে কথা বলতেছি। বজরাটা ছোটখাটো ঘরের মত। এর ভিতরেই শোবার জায়গা, রান্নার জায়গা, একপাশে টয়লেট। ইঞ্জিনেও চালানো যায় আবার পাল দিয়েও। এখন বাতাস অনুকূলে আছে বলে চাচা হাল ধরে বসে আছেন পাল টানিয়ে। মাঝেমাঝে টর্চ জ্বালিয়ে চারপাশ দেখছেন। আমি পাশে বসে উসখুস করতেছি। কারণ এখনও আমাকে ঐ ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি। ওদিকে শ্রাবনী আবার বাতি নিভিয়ে অন্ধকারে বসে আছে। কাহিনী কিছুই বুঝতেছি না! আমিও ওদের সাথে ভেসে চলেছি। নিজের জীবনের মোড় ঘুরে গিয়েছে। তাই সাথে যা ছিলো তাই নিয়েই ওদের সাথে থাকতেছি। দেখি কি হয়… বৃদ্ধ কিছক্ষন উদাস মনে নদী দেখলেন। তারপর আমার দিকে ফিরে কথা বলতে শুরু করলেন। -আমি এখন তোমারে যে ঘটনা বলবো তা হয়তো তুমি বিশ্বাস করবা না। জানতে চাইছো যেহেতু তাই বলতেছি। শুধু ওয়াদা দাও যে এ সম্পর্কে কাউরে কিছু বলবা না। তুমি আমাদের জীবন বাঁচাইছো। তাই সেই বিশ্বাসেই বলতেছি। -এগুলা আর বলবেন না চাচা। আমার মানুষ হিসেবে যে দায়িত্ব ছিলো তাই পালন করেছি। শুধু দুর্ভাগ্য যে চাকুর আঘাত খেয়ে আপনাদের সমস্যা আরো বাড়িয়েছি। আর আপনার মেয়ে না থাকলে আমি এতক্ষনে হয়তো … -আচ্ছা বাবা। শোনো তাহলে… বলেই চাচা শুরু করলেন তাদের কাহিনী। অর্ধচন্দ্রের আলোয় সে কাহিনী শুনে আমি একই সাথে রোমাঞ্চিত আর চিন্তিত হলাম। উনি যা বললেন তার সারসংক্ষেপ হলো… শ্রাবনী ওনার নিজের মেয়ে না। ওনার স্ত্রী মারা যায় অনেক আগেই। তারপর থেকে উনি একাই থাকেন। মাছ ধরে কোনোমতে তার দিন চলতো। এক ঝড়ের রাতে তিনি বহু কষ্টে সাগর পাড়ি দিয়ে তার নিজস্ব প্লাটফর্মে নৌকাটা বাঁধলেন। সমুদ্রতীর ধরে বাসায় ফিরছিলেন। হঠাৎ খানিকটা দূরে একটা নৌকা দেখলেন যেটা তীরের একটু ভিতরের দিকে বৃষ্টির পানিতে সৃষ্ট একটা ছোটখাটো পুকুরে দুলছিলো। নৌকাটা থেকে তিনি ক্রমাগত একটা বাচ্চার কান্নার আওয়াজ পেয়েছিলেন। বাচ্চাটা কান্না থামাচ্ছিলো না। তাই তিনি কৌতুহলি হয়ে সেটার কাছে গেলেন। কাছে যেতেই তিনি বুঝতে পারলেন নৌকাটা ঝড়ে বিদ্ধস্ত। কান্নার উৎস খুঁজতেই তিনি ভয়ানক চমকে উঠলেন। নৌকার ভিতরে পানি উঠেছে অল্প। তাতে একটা ৬-৭ মাসের বাচ্চা পড়ে আছে। বাচ্চার পাশে একজন পুরুষ ও একজন মহিলা মরে পড়ে আছে। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো পানির মধ্যে কিছু বৈদ্যুতিক বাইন মাছ বা ইলেক্ট্রিক ইল সাঁতার কাটছে। তার মনে হলো এই মাছের শকেই হয়তো মানুষ দুজন মারা গেছেন। ইলেক্ট্রিক ইলের বৈদ্যুতিক শক ঘোড়াকেও কাবু করে ফেলে। কিন্তু বাচ্চাটা এর মধ্যে দিব্যি বেঁচে আছে আর কাঁদতেছে। তিনি খুব সাবধানে বাচ্চাটাকে উঠিয়ে নিলেন পানি থেকে। তারপর নিজের পড়া কাপড় দিয়ে বাচ্চাটাকে মুড়ে নিলেন। আর তাড়াতাড়ি ঐ জায়গা থেকে চলে গেলেন। কারণ মানুষ দুজন মরে যাওয়ার দায় তার উপর পড়তে পারে। আর এভাবে বাচ্চাটাকে ফেলে গেলে নির্ঘাত মারা পড়বে। তাই তিনি বাচ্চাটাকে সাবধানে তুলে নিয়ে রাখলেন একটা পলিথিনের ভিতরে। তারপর কোলে করে কোনোমতে বাসায় ফিরলেন। বাচ্চাটা ক্রমশ কেঁদে চলছিলো। উনি তারপর বাচ্চাটাকে মুছিয়ে দিয়ে দুধ বানিয়ে খাওয়ালেন। তারপর বাচ্চাটা একটু শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লো । তারপর উনি সব মোটামুটি একটু গুছিয়ে নিয়ে আবার মনযোগ দিলেন বাচ্চাটার দিকে। বাচ্চাটা একটা মেয়ে। কাথার মধ্যে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। মুখ থেকে হালকা একট গোলাপি আভা বের হচ্ছে। পরেরদিন বাচ্চাটার কান্না শুনে তার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। তিনি তারাতারি বাচ্চাটাকে খাইয়ে দিলেন। তারপর তার বিশ্বাসযোগ্য এক প্রতিবেশী মহিলার কাছে বাচ্চাটাকে নিয়ে রাখলেন। মহিলাকে সব খুলে বলেন উনি। সেই মহিলাই তারপর বাচ্চাটাকে পালার দায়িত্ব নিলেন। মেয়েটার নাম রাখা হলো শ্রাবনী। অবিশ্বাস্য ভাবে উনি লক্ষ্য করলেন যে কয়েকদিনের ভিতরেই শ্রাবনীর চোখের মণি কালো থেকে লাল বর্ণ ধারণ করলো। আরও একটা নতুন সমস্যার সৃষ্টি হলো। মেয়েটা দিনের বেলা চোখ খুলতে পারে না। ওর চোখে আলো ঢুকে ওকে প্রায় অন্ধ করে দেয়। কিন্তু ও রাতের বেলা অন্ধকারে পুরোপুরি এবং ভালোভাবেই দেখতে পায়। শ্রাবনীকে নিজের মেয়ের মতো করে গড়ে তুললেন তিনি। অপার ভালোবাসা আর নিরাপত্তায় মেয়েটা বড় হতে লাগলো। শ্রাবনীর এসব অস্বাভাবিকতার কথা তিনি গোপন রাখলেন। শ্রাবনী একটু বড় হতেই মহিলা মারা যায়। তারপর নিজের কাছেই এনে রাখলেন তিনি। শ্রাবনী যখন ৪ বছরের তখন তিনি শ্রাবনীকে বই পড়ানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু মেয়েটাকে যতই শেখাতে চান মেয়েটা পারে না। কোনো লেখার দিকে তাকালেই ওর মনে হয় লেখাগুলো দৌড়াদোড়ি করছে। তাই তিনি মুখে মুখে যা পারলেন তা শিখালেন। মেয়েটার স্মৃতিশক্তি অসাধারণ। একবার বললেই সব মনে থাকে। শ্রাবনীর সবচেয়ে অদ্ভুত বেপার ওর হিলিং পাওয়ার। এটা জানা যায় যখন ওর বয়স দশ বছর। একদিন তার হাত কেটে গেলে শ্রাবনী ব্যান্ডেজ করতে যায়। তখন তার হাতটা গরম হয়ে যায় শ্রাবনীর স্পর্শে আর ক্ষতটা খুব দ্রুত মিলিয়ে যায়। এটাই তাদের কাহিনী। ৬. আমি বৃদ্ধ চাচার বর্ণণা শুনে হতভম্ব হয়ে গেলাম। এও ঘটতে পারে মানুষের জীবনে! আমি বেপারটা একটু বোঝার চেষ্টা করলাম। ইলেক্ট্রিক ইল এর শকের ফলে হয়তো শ্রাবনীর ক্রোমোসোমে অবস্থিত জিনের ডিএনএ কোডিং এ হালকা পরিবর্তন হয়। তার ফল স্বরূপ হয়তো এসব ঘটনা ঘটছে। চোখ লাল হয়ে যাওয়ার সাথে হয়তো অবলাল বা ইনফ্রারেড রে দেখার ক্ষমতাও পেয়ে গিয়েছে মেয়েটা। এজন্যেই হয়তো রাতে দেখে কিন্তু দিনে দেখে না। মানুষের চোখ শুধু দিপ্তিমান আলো দেখতে পায়। চোখ থেকে আলো পাঠায় না। কিন্তু শ্রাবনীর ক্ষেত্রে বেপারটা উলটো। এখানে ওর চোখ ইনফ্রারেড আলো পাঠায় বস্তু দেখার জন্য। নিশাচর প্রাণিরা এটা করে থাকে। আর অন্ধকারে থাকার জন্য গায়ের রঙ ড্রাকুলাদের মত সাদা হয়ে গিয়েছে ওর। বই এর লেখাগুলো দৌড়ানোর বেপারটা হলো এক প্রকারের স্কিতজোফ্রেনিয়া। এটা একধরণের সাইকোলোজিকাল ডিজিজ। একটা সাইকোলজির বই পড়ে আমি এ রোগটা ও এরকম আরো রোগ সম্পর্কে জেনেছিলাম। এ রোগটার বেপারে আমি হয়তো কিছু করতে পারবো। কিন্তু ওর আরোগ্য করার ক্ষমতার বেপারে আমার কিছুই জানা নেই। এটা সম্পূর্ণ নতুন কিছু। দেখা যাক কতদূর কি গড়ায়! বজরা এসে হাতিয়া পৌছলো তখন প্রায় সকাল আট টা বাজে। আমি মোটামুটি সুস্থ হয়ে গেছি। চাচা স্থানীয় জেলেদের সাথে মাছ ধরতে গেছেন। আমি আমার ব্যাগ চেক করে দেখলাম সব ঠিকই আছে। মোবাইল, কিছু খুচরা টাকা আর ক্রেডিট কার্ড। শ্রাবনী যথারীতি অন্ধকারে গিয়ে বসেছে। আমার খুবই অস্বস্তি লাগছে। নৌকাটা ঘাটে বাঁধা। লোকজন সবাই যার যার কাজ করছে। এদিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। আমি একা একা সামনে বসে আছি। একবার নৌকা থেকে নেমে আমি খানিকটা ঘুরে আসলাম। ওদের জন্য কিছু আপেল আর নিজের জন্য একটা ঢাকার লঞ্চের টিকেট কিনলাম। একা একা ভাল লাগছিলো না। তাই ভিতরে গিয়ে শ্রাবনীর সাথে কথা বলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু অন্ধকারে কিছু দেখা যায় না। দম বন্ধ হয়ে আসার অনুভূতি হয়। -ইয়ে মানে, শ্রাবনী। আছো? -হ্যাঁ। আপনার কিছু লাগবে? -না। মানে একা একা ভালো লাগছিলো না। তাই একটু গল্প করতে আসলাম! -ওহ। -তা তোমার অসুবিধা হয়না এই অন্ধকারে? -নাহ। কারণ আমি সব কিছুই স্পষ্ট দেখতে পারছি। আপনার কপালের কাটা দাগটা হলো কিভাবে? নিজের অজান্তেই দাগটায় হাত দিলাম। বললাম -ছোটবেলায় কেটে গিয়েছিলো। আর তুমি আমাকে আর আপনি করে বলবে না। আমি তোমার চেয়ে তেমন বড় নই। আর আপনি শুনলে নিজেকে কেমন যেন বুড়ো বুড়ো লাগে। বলার পর হাসির শব্দ শুনতে পেলাম। কিন্তু কিছুই দেখতে পেলাম না। কয়েক জায়গায় খুব ছোট ছোট ছিদ্র থাকার দরুন অন্ধকার আকাশের তারার মতো মনে হচ্ছে। -আচ্ছা ঠিক আছে। বলবো না। -হুম। তুমি কখনো বাইরের পৃথিবী দেখেছো? -হ্যাঁ। রাতের আলোতে… মানে তোমাদের অন্ধকারে। -কখনো বৃষ্টিতে ভিজেছো? -নাহ। কিন্তু আমার খুব ইচ্ছে হয় বৃষ্টিতে ভিজতে। তুমি ভেজো? -হুম খুব! জানো আমার একটা ইচ্ছা আছে। -কি সেটা? অন্ধকারের কারণে তার মুখের অভিব্যাক্তিটা দেখতে পাচ্ছি না। মানুষের মুখ দেখলে অনেক সময় তার মনের অবস্থা সম্পর্কে বোঝা যায়। আমি মুখটা হাসি হাসি করে বললাম -আমার একটা প্রেমিকা থাকবে আর আমি বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে তার কোলে মাথা রেখে বই পড়বো! -আপনি মানে তুমি অনেক মজার মানুষ। আর স্বপ্নীল! আসলে আমি সবার থেকে গোপন থাকি তো, তাই মানুষের অনুভূতি সম্পর্কে তেমন কিছু জানি না। এরপরই একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনতে পেলাম। কারণটা স্পষ্ট। মানুষ একা থাকতে পারে না। তার দরকার সঙ্গী। -কিন্তু একটা সমস্যা আছে। -কি সমস্যা? -বৃষ্টিতে বই পড়া যাবে না। বই এর পাতা ভিজে যাবে! -প্লাস্টিকের বই নেই? -আমম! থাকতে পারে। আসলেই তো। আমার এই আইডিয়াটা মাথায়ই আসেনি। আমি তোমার সমস্যার কথা শুনলাম। তুমি কি বই পড়তে চাও? -হুম খুব চাই। কিন্তু পরতে পারি না। -জানি। তোমার রোগটা একপ্রকার স্কিতজোফ্রেনিয়া। এই রোগের চিকিৎসা আছে। -থাকলেও বা কি? আমার তো বাইরে যাওয়া নিষেধ! -হুম! এই সময়ই চাচা বজরায় এলেন। তাই আপাতত শ্রাবনীর সাথে কথা বলা শেষ করলাম। খেয়ে দেয়ে বিকেলের লঞ্চে আমি ঢাকার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। আমার মোবাইলটা ওদের কাছে দিয়ে এসেছি। শ্রাবনীকে শিখিয়ে দিয়েছি কিভাবে ব্যবহার করতে হয়। ওর ব্যবহারের সুবিধার জন্য মোবাইলের ব্রাইটনেস কমিয়ে দিয়েছি। এবার আমার কাজ করার পালা। ৭. গত দুইদিন আমার খুব ব্যস্ততার মধ্যে কেটেছে। আমি কয়েক যায়গায় দৌড়াদৌড়ি করে দুইটা জিনিস জোগাড় করেছি। তিনসেট কালো অপটিক লেন্স আর কয়েকটা লাল প্লাস্টিকের শিট। পৃথিবীতে টাকা দিলে সবই পাওয়া যায়। মেয়েটাকে আমার ভালো লেগেছিলো। তাই ওর জন্য এসব করছি। সাধারণত অপটিক লেন্সে ছিদ্র থাকে। যার ফলে আমরা স্টাইল করার জন্য যেকোনো লেন্স ব্যাবহার করতে পারি। এতে আমাদের দেখায় কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু এখানে কেসটা ভিন্ন। তাই আমাকে অর্ডার দিয়ে ছিদ্র ছারা লেন্স বানাতে হয়েছে যার রঙ পুরোটাই কালো। রঙের ঘনত্বের ভিন্নতা অনুসারে আমি তিনসেট লেন্স বানিয়েছি। এগুলো ওয়াটারপ্রুফ আর সহজে নষ্ট হয় না। আর এক ডাক্তারের সাথে আলাপ করে স্কিতজোফ্রেনিয়ার জন্য লাল শিটগুলো বানিয়েছি। তারপর সেগুলো নিয়ে আমি আবার সোনাদিয়া দ্বীপে রওয়ানা হলাম। ও হ্যাঁ, আমি একটা নতুন মোবাইল আর সিমও কিনে নিয়েছি। হাতিয়া পৌছতে দুপুর হয়ে গেলো। মোবাইল করে জানতে পারলাম ওরা আরো পশ্চিমে সরে গিয়েছে। খানিকটা খোঁজার পর পেলাম বজরাটাকে। চাচা রান্না করছেন। আর শ্রাবনী যথারীতি অন্ধকারে। আমার ভিতরের উত্তেজনা আমি চাপিয়ে রাখতে পারছিলাম না। লেন্স আর শিটে কাজ হবে কি না তা জানার জন্য আমি ব্যাস্ত হয়ে পড়লাম। তাই চাচার সাথে হালকা কথা বলেই অন্ধকার কামরায় ঢুকলাম। -ইয়ে মানে শ্রাবনী! -তুমি এতো ইয়ে ইয়ে করো কেন? -হে হে হে। নার্ভাস খুব। তাই মে বি। -কেমন আছো? -এইতো ভালই। তোমার জন্য একটা জিনিস এনেছি! -কি? -এইতো কয়েকটা লেন্স। -লেন্স কি? -চোখে পড়তে হয়। দেখতে পাচ্ছো এগুলো? -হুম। কিভাবে পড়ে? -এইভাবে … বলে অন্ধকারে একটা লেন্স নিজে পড়ে ওকে দেখালাম। তারপর বললাম -এখানে তিনসেট আছে। দেখো কোনটা দিয়ে তুমি দেখতে পারো! আর একটা বেপার, এগুলো শুধু দিনের বেলাই পড়বে। এই নাও। ও আমার হাত থেকে লেন্সের বক্সটা নিলো। নরম একটা হাতের ছোঁয়া পেলাম। তারপর আমি বের হয়ে আসলাম বাইরে। চাচা ভাত বেড়ে আমাকে খেতে ডাকলেন। আমি হাত ধুয়ে খেতে বসলাম। খাওয়ার মাঝামাঝি সময়ে শ্রাবনীর গলার স্বর শুনলাম। ওর বাবাকে ডাকছে। কিন্তু কন্ঠস্বরটা এসেছে আমার একদম ঠিক পিছন থেকেই। পিছনে ফিরতেই আমি ভিমরি খেলাম। গলার ভিতর ভাত ঢুকে কাশতে কাশতে আমার অবস্থা খারাপ হয়ে গেলো! ৮. শ্রাবনী বাইরে আলোতে আমার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে থ্রি পিচ আর চোখের রঙ কালো। চোখ খুলে রেখেছে। গায়ে একটা অন্যরকম আভা। ওকে এ অবস্থায় দেখে ওর বাবা অবাক হয়ে বলে উঠলো… -মা, তুমি বাইরে বের হইলা কিভাবে? -আমি এখন দিনের আলোতে দেখতে পারছি বাবা! -হায় আল্লাহ! বলেই উনি কেঁদে দিলেন। -এটা আরিয়ানর জন্য হয়েছে বাবা! শ্রাবনী ওর বাবার কাধে হাত রেখে বললো। আর আমি কিছু না বলে চুপচাপ হাসতেছি মিটিমিটি। তারপর আমি জিজ্ঞেস করলাম -কেমন লাগছে নতুন দুনিয়া? রঙগুলো দেখতে পাচ্ছো তো ঠিকমত? -হুম। সব কিছু নতুনের মত লাগছে। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। তোমার এই ঋণ আমি জীবনেও শোধ করতে পারবো না। -“তোমার শোধ করা লাগবে না। তুমি শুধু আমার হও!” আমি মনে মনে বললাম। কিন্তু মুখে বললাম -আরেহ! এটা কোনো বেপারই না। আমি শুধু অনুমান করলাম আর জাস্ট তার প্রয়োগ করলাম। আমি জানতামও না যে এতে কাজ হবে! -তারপরও… -উহু আর কোনো কথা নয় এ বেপারে। চাচা কিছুই বলছেন না। নীরবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে গিয়েছেন। নিজেকে খুব খুশি লাগছে। একটা মানুষের অনেক বড় উপকার করতে পারলাম। একটা মানুষ নয়, নিজের জীবনের নতুন ভালোলাগা মানুষটাকে! এরপর আমরা খেয়ে দেয়ে উঠলাম। শ্রাবনী তো ভিতরেই যেতে চায় না আর। বাচ্চা মেয়ের মত আচরণ করছে এখন। বসে বসে জীবনের প্রথম সূর্যাস্ত দেখছে। আমিও গিয়ে ওর পাশে বসলাম। শেষ দিগন্তের আলোয় ওর মুখটা খুশিতে ঝলমল করছে। আমি তারাতারি মোবাইল বের করে নিশ্বব্দে কয়েকটা ছবি তুলে নিলাম। হঠাৎ ও আমার হাতে হাত রেখে একটা আলতো চাপ দিলো। ৯. পরেরদিন শ্রাবনী আমাকে ঘুম থেকে তুললেন। আমি বলতে গেলে এখন ওদের পরিবারেরই সদস্য। আজকে আরেকটা চমকের পালা। আমি মনে করেই মুচকি হেসে উঠে পড়লাম। আমি শ্রাবনীর হাতে একটা বই দিয়ে বললাম -পড় এটা। -আমি বই এর লেখা পড়তে পারি না। আমার কাছে এগুলো এলোমেলো লাগে। -আহা! আগে দেখই তো না! -দেখলাম। আগের মতই হিজিবিজি। -হুম! আমি তারপর একটা লাল শিট দিলাম বই এর পাতার উপরে। তারপর আবার পড়তে বললাম ওকে। ও বই এর দিকে তাকিয়ে যেন বজ্রাহত হলো। পাক্কা এক মিনিট বই এর দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো। আমি বুঝতে পারলাম যে আমি সফল হয়েছি আরো একবার। ও বই এর লেখা ঠিকভাবে দেখতে পারছে। ও কোনো কথা বলছে না। চোখ দিয়ে শুধু পানি পড়ছে ওর। আমি ওকে ঐ অবস্থায় রেখে উঠে এলাম। ওকে একান্ত কিছু সময় দেয়া দরকার। আজ প্রায় পনেরদিন হয়ে গেলো শ্রাবনী পড়তে পারে। ওর স্মৃতীশক্তি অসাধারণ। শের এ বাংলা এ.কে. ফজলুল হকের মতো কোনো লেখা একবার পরেই মনে রাখতে পারে। এ কয়দিন ও শুধু পড়ালেখা করেই কাটিয়ে দিয়েছে। আমি ওকে পড়তে আর লিখতে শিখিয়ে দিয়েছি। প্রথমে লিখতে খুব অসুবিধা হত। ছোটবেলা থেকে না লেখার কারণে হাত আর ব্রেনের সমন্নয়ে লিখতে ওর অনেক সময় লেগেছে। ঠিকভাবে লিখতে না পারলেও পড়া অনেক তাড়াতাড়ি আগাচ্ছে। আমি গত কয়েক বছরে পাঠ্যবই এর পড়া অনেকটাই ভুলে গিয়েছিলাম। ওর জন্য আমার কেনা বই গুলো দিয়েই আমি নিজের পড়া ঝালাই করে নিলাম। আরেকটা আশ্চর্য বেপার ঘটেছে। আমি চাচাকে পড়ালেখা না করা এক সাধারণ জেলে ভেবেছিলাম। কিন্তু আমি অবাক হয়ে দেখলাম সে আমাকে ইন্টারের ম্যাথ করা শিখিয়ে দিয়েছে। আর তার পড়ালেখাও আগে অগাধ ছিলো বুঝলাম। তা ওনার এখনকার কথাবার্তা শুনলেই বোঝা যায়। শ্রাবনী পড়তে পারছে শুনে তিনি পুরোই বদলে গেলেন। এখন উনি শুদ্ধ ভাষায় কথা বলেন। আর শ্রাবনী আর আমাকে পড়ান, কাজ করার ফাঁকে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে উনি এসব কোথায় শিখলেন। কিন্তু উনি কথার প্যাঁচে প্রসংগ বদলেন ফেলেন। হয়তো আমাকে বলতে চান না। কিছু একটা ঘাপলা আছে। শ্রাবনীও অবাক হয়েছে ওর বাবার এই পরিবর্তনে। সবকিছুই ভালো চলছিলো। শ্রাবনী অনেক পড়াশুনা করে এখন প্রায় আঁতেল হয়ে গেছে। মাঝেমাঝেই কবিতা আউরায়। নিজের লেখা কবিতা! একটা কবিতা লিখলো… তোমার শুন্য বুকের তলে অগ্নিশিখা বুঝি জ্বলে, তেপান্তরের মাঠ পুড়েছে পুড়েছে মস্ত আকাশের ঝোপ। ছাই হয়ে গেছে উর্বর ফসলি জমিন, তবু থামেনি তোমার অনল দগ্ধ দহন। আমি উর্বরা নই… নই সজল দিগন্তের মাঠ, পোড়াও আমায়, জ্বলবো অনন্তকাল। আমি যে দহনের ইন্ধন, আমি জ্বলন্ত অঙ্গার! আমি কবিতাটা পরে পুরা টাসকি খেয়ে গেলাম। এতো সুন্দর করে কবিতা লিখতে পারে মেয়েটা! নতুন করে প্রেমে পড়লাম ওর। মায়ায় জড়িয়ে রাখে পৃথিবীকে। আসলে ওর আমার দেয়া নামটা ঠিকই ছিলো… লাল চোখের মায়াবতী! ১০. ওরা কি ভাববে জানি না। কিন্তু আমি আমার বাকি জীবন ওদের সাথেই কাটিয়ে দিতে চাই। আসলে ঘর থেকে বের হয়ে এই প্রথম নিজেকে সংসারের প্রতি টান অনুভব করলাম। কিন্তু চাচার ব্যাপারটা রহস্যই থেকে গেলো। আমি একটু বের হয়েছি কিছু কেনাকাটা করতে। চিন্তা করলাম বাসায় বা বজড়ায় ফিরে এ প্রসংগটা তুলবো। এখন নিজেও মাছ ধরা শিখতেছিলাম। আর নিজের ব্যাংকের টাকা তো আছেই। তাই খাওয়া পড়ার ব্যাপারে আমার আপাতত কোনো চিন্তা নেই। আমি এসব চিন্তা করতে করতে ফিরতেছিলাম। কিন্তু বজড়ায় উঠে আমি অবাক হয়ে গেলাম। কেউ নেই বজড়ায়। পুরো বজড়া লন্ডভন্ড। -কি ব্যাপার! ওরা গেলো কই? নিজেকেই প্রশ্ন করলাম। কিন্তু উত্তর পেলাম না। খুঁজে দেখলাম খানিকটা ধস্তাধস্তির চিহ্ন আছে। চিন্তায় পড়লাম। ওদের কিছু হলো না তো? বজড়ার পাশে কয়েকজন জেলে দাঁড়িয়ে জটলা পাকিয়ে কথা বলছিলো। আমি এগিয়ে গিয়ে তাদের সাথে কথা বলে যা জানতে পারলাম তা হল… আমি বের হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই একটা ছোট সাদা নীল ডোরাকাটা বোটে কয়েকজন মানুষ এসে বজড়ায় ওঠে আর জোর করে চাচা আর শ্রাবনীকে ধরে নিয়ে যায়। বোটটা দেখলে যে কারই মনে থাকবে তার অদ্ভুত রঙের কারণে। এই খানিক্ষণ আগেই গিয়েছে তারা। জিজ্ঞেস করলাম কোনদিকে গিয়েছে। তারা বললো কক্সবাজারের দিকে। আমি আতঙ্কিত হলাম। কারণ কক্সবাজারের ওরাও হতে পারে। -কিন্তু সেই কবের কাহিনীর জন্য ওরা এখানে আসবে? নাহ! হিসাব মিলছে না। অন্য কাহিনী আছে। যেন নিজেকেই শুধালাম। তারপর বজড়ায় তালা দিয়ে একটা স্পিড বোট ভাড়া করে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। সাথে আমার ব্যাকপ্যাক আর একটা একটা হালকা পকেট নাইফ। এবার খালি হাতে যাওয়ার ভরসা পেলাম না। জানি না এই ছোট অস্ত্রটা কোন কাজে লাগবে। এখন পিস্তল জোগাড় করার সময় নেই। আগেরবার মানবতার খাতিরে এগিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু এবার আমার ভালবাসাকে বাঁচাতে হবে। তাই তাড়াতাড়ি নেমে পড়লাম। ১১. প্রায় দুই ঘন্টার মাথায় আমি কক্সবাজার পৌছলাম। কয়েক জায়গায় ডোরাকাটা বোটের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতে জানলাম বোটটা মহেশখালি প্রনালীতে ঢুকেছে। আমিও ঢুকলাম স্পিড বোট নিয়ে। খানিকটা এগোতেই দেখলাম জিনিসটাকে। অনেক অদ্ভুত দেখতে। সাদা নীল ডোরাকাটা দাগ গায়ে। অন্য কোনো সময় হলে এক কথাতেই বোটটার প্রশংসা করতাম। কিন্তু এখন ভিন্ন ব্যাপার। এটা পার্সোনাল বোট। দেখেই বুঝেছি। এরকম ডিজাইন আর কালার কোনো সাধারণ বোটে থাকে না। নাম সি গার্ল! এটাও বুঝলাম যারা ওদের ধরে নিয়ে গেছে তাদের টাকা পয়সার অভাব নেই। এবার কিন্তু সত্যিই ঘাবড়ে যাচ্ছি আমি। কি করবো বুঝতে পারতেছি না। জেটিতে নেমে বোটের ভাড়া দিয়ে দিলাম। তারপর স্থানীয় লোকদের কাছে সি গার্লের ব্যাপারে খোঁজ নিলাম। কিন্তু কেউই বোটটা সম্পর্কে কিছু বলতে পারলো না। তাই চিন্তা করলাম নিজেই বোটটার কাছে যাবো। যেই ভাবা সেই কাজ। কিন্তু বোটটার কাছে যেতে যেতে দেখলাম একটা প্রাইভেট জীপ এসে ওটার সিড়ির কাছে এসে থেমেছে। দরজা খুলে গেলো ভিতর থেকে। আমি একটা থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম কি ঘটে। খানিকটা পড়েই দুইজন লোক শ্রাবনী আর চাচাকে নিয়ে গাড়িতে তুললো। ওরা চুপচাপ জীপে উঠলো। কিছুই বললো না। দেখলাম লোক দুইজনের কোমরে কোল্ট রিভলবার রাখা। আরো দুইজন সুট পড়া লোক গাড়িতে ঢোকার পরেই গাড়িটা ছেড়ে দিলো। শ্রাবনীদের পিছনে বসানো হয়েছে। আর বাকি সুটওয়ালা দুইজন সামনে বসেছে। ওরা ওঠার পরেই গাড়ি ছেড়ে দিলো। আমি এক দৌড়ে জেটি পার করে রাস্তায় আসলাম। গাড়িটাকে নজরেই রেখেছিলাম। এদিক ওদিক তাকালাম কোনো যানবাহন পাই কি না। কিন্তু ভাগ্য মনে হয় আমার সাথে ছিলো না। তাই কোনো কিছুর ব্যাবস্থা করার আগেই গাড়িটা একটা টিলার কাছে বাঁক নিয়ে হারিয়ে গেলো। আমি হতাশায় রাস্তার উপরেই বসে পড়লাম। হঠাৎ আমার পিছনে একটা গাড়ির হর্ণ শুনলাম। পিছনে ফিরতেই আমার মুখ উজ্জ্বল হলো। একটা মাহেন্দ্র দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে পথ থেকে সরতে সিগনাল দিচ্ছে। আমি তাড়াতাড়ি উঠে মাহেন্দ্রটাতে বসলাম। এটা খালি ছিলো। ড্রাইভারকে বললাম গাড়িটা যেদিকে গিয়েছে সেদিকে যেতে। ড্রাইভার জানালো কিছুদূর গেলেই শহরের বাইরে চলে যেতে হবে। যায়গাটা নির্জন। আসলে এসব জায়গায় স্মাগ্লিং হয়ে থাকে। সীমান্তবর্তী হওয়ায় এ জায়গাটা নিরাপদ নয়। আমি একটু দ্রুত তাকে চালাতে বললাম। মাহেন্দ্র যতটা বড় দেখায় তার তুলনায় অনেক হালকা। তাই ছোটে প্রায় ঝড়ের বেগে। খুব তাড়াতাড়িই আমরা গাড়িটা ধরতে পারলাম। তারপর ড্রাইভারকে বললাম একটু দুরত্ব রেখে অনুসরণ করতে। প্রায় দশ মিনিট পর আমরা একটা বড় টিলার কাছে পৌছলাম যার একেবারে পাশ ঘেষেই সাগর। আমি খানিকটা আগে থাকতেই নেমে পড়লাম গাড়িটা থামতে দেখে। ড্রাইভার আমাকে সাবধানে থাকতে বলে চলে গেলো। দেখলাম ঐ গাড়ির ড্রাইভার গাড়ি থেকে নেমে টিলার উপরে উঠে গেলো। একটা পায়ে চলা পথ আছে। মনে হয় উপরে বাসা বা ঘর জাতীয় কিছু থাকতে পারে। আমি ধীরে ধীরে পাশের জঙ্গলের মধ্যদিয়ে সব দেখতে থাকলাম আর এগোতে থাকলাম। জায়গাটা আসলেই নির্জন। শুধু পাখির ডাক আর সাগরের ঢেউ এর বারি লাগার শব্দ শোনা যাচ্ছে বেশি করে। এবার সামনে একজন আর পিছনে বাকিরা যেতে শুরু করলো। মাঝখানে শ্রাবনী আর ওর বাবা। ওদেরকে একপ্রকার ঘিরে নিয়েই টিলা বেয়ে নিয়ে যাওয়া হলো। আমি খানিক্ষণ অপেক্ষা করলাম। তারপর যেটা মনে করেছিলাম সেটাই হলো। ড্রাইভার আর একটা লোক বাইরে এসে গাড়ি ঘুরিয়ে শহরের দিকে চলে গেলো। তারমানে এখন ভিতরে কমপক্ষে তিনজন লোক আছে শ্রাবনীরা ছাড়া। আরো লোক থাকতে পারে ভিতরে। যাই হোক আমি সামনে এগোতে শুরু করলাম। ১২. আমি পায়ে চলা পথটা ধরে হেঁটে গেলাম। খুব ধীরে ধীরে নিঃশব্দে পা ফেলতে লাগলাম। পথটা ধরে টিলা বেয়ে উঠতে লাগলাম। আকাশ কালো হয়ে আসছে। খুব সম্ভব ঝড় হবে। তাই একটু তাড়াতাড়ি পা ফেলে এগোতে থাকলাম। খানিকটা উপরে উঠতেই দেখা পেলাম একটা পুরোনো বাড়ির। বাড়িটা কালো রঙের। উপরে কালো টিন দেয়া। মোটামুটি টিলার উপরের প্রায় সবটাই দখল করে আছে। দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করা। ওরা হয়তো ভিতরেই আছে। আমি চিন্তা করতে লাগলাম কিভাবে ভিতরে ঢোকা যায়। বেশি খোঁজা লাগলো না। দেখলাম কয়েকটা জানালা খুলে গিয়েছে ভিতর থেকে। আর জানালায় ও কোনো শিক নেই। মানে পুরো খোলা জানালা। মনে হয় এখানে আগে কোনো হস্তশিল্পের কারখানা ছিলো। জানালা খুলতে দেখেই আমি ঝট করে নুইয়ে গেলাম। মনে হয় কেউ দেখতে পায়নি। খানিকটা অপেক্ষা করে আমি আবার নুইয়ে নুইয়ে আগালাম একটা জানালার কাছে। জানালার কাছে গিয়েই একটু উকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম। বাইরে থেকে ঘরটা পুরোনো দেখালেও ভিতরটা প্রায় ঝকঝক করছে। বুঝলাম এখানে আসার আগে জায়গাটা পরিস্কার করা হয়েছে। এঘরে কেউ নেই। পাশের জানালায় গিয়ে উকি দিলাম। হ্যাঁ। ঐতো ওরা। ওদের চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়েছে। পাশে রিভল্বার হাতে এক চ্যালা টাইপের লোক দাঁড়িয়ে আছে। আর আরেকপাশে চেয়ারে বসে আছে সুটপড়া লোক দুইটা। আমি আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম কি হয়। মনে হয় এতক্ষন সব কিছু গুছিয়ে নিচ্ছিলো ওরা। বাম পাশের লোকটা কথা বলতে শুরু করলো প্রথম। -তো ডক্টর মাহমুদ হাসান! কি মনে করেছিলেন, আমরা আপনাকে খুঁজে পাবো না? আমাকে অবাক করে দিয়ে চাচা কথা বলে উঠলেন। শ্রাবনীও অবাক হয়ে ওর বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। -জানি না। এভাবে ধরে আনার মানে কি ডঃ রফিক? … গম্ভীর হয়ে জানতে চাইলেন। -আপনি খুব ভালো করেই জানেন। ২৫ বছর ধরে আপনার খোঁজ করছি। কেনো করছি আপনি জানেন না? -ইউটোপিয়া? ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন শ্রাবনীর বাবা। -হুম। আমরা জানতাম আপনি সাগরের তীর ঘেসেই থাকবেন। কিন্তু দেশে থাকবেন যে, আর তাও জেলের বেশে তা বুঝতে পারিনি। এজন্যই এতোদিন লেগেছে সারা পৃথিবী চষে বেড়িয়েছি। এট লাস্ট পেলাম। -কিন্তু আমি এখনও ইউটোপিয়ার খোঁজ় পাইনি! -আহা! তা কি করে হয়। তাহলে এতো বছর বিজ্ঞান একাডেমি আর আপনার নিজের লোকদের কাছ থেকে দূরে থাকলেন কেন? আমি আর শুনতে পেলাম না। মাথার পিছনে একটা শীতল স্পর্শ অনুভব করলাম। বন্দুকের নল। হাত দুইটা উপরে তুলে যেই ঘুরতে যাবো অমনি কিছু একটা দিয়ে আঘাত করা হলো আমার মাথায়। লাল একটা পর্দা আমার চোখের সামনে এসেই সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল। ১৩. আরিয়ান… আরিয়ান… আমার মাথাটা ঝিম ঝিম করতেছে। মনে হলো দূর থেকে কেউ আমাকে ডাকছে। অনেক কষ্টে চোখ খুলে তাকালাম। হুম যা মনে করেছি। শ্রাবনী-ই ডাকছে আমাকে। নড়ে বসতে গেলাম। কিন্তু নড়তে গিয়েই বুঝলাম আমাকে চেয়ারে বেঁধে রাখা হয়েছে। চোখের দৃষ্টি ঠিক হতেই দেখলাম ওদের ও বেঁধেছে। শ্রাবনী আমার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। চোখের ভিতরে শঙ্কা দেখতে পেলাম ওর। চাচা মাথা নিচু করে বসে আছেন। মনে হয় অনুতপ্ত। বাইরে মুষল ধারে বৃষ্টি হচ্ছে। একই সাথে টিনের চালের বৃষ্টির শব্দ আর সাগরের উত্তাল ঢেউ এর বাড়ি লাগার শব্দ শুনতে লাগলাম। আচ্ছন্ন করে দেয় চেতনাকে। আমাকে একটু ধাতস্ত হতে সময় দিলো ওরা। তারপর শ্রাবনী প্রথম কথা বললো -কেমন লাগছে এখন? -আমমম।। ব্যাথা খুব। -আমার হাত খোলা থাকলে হয়তো সারিয়ে দিতে পারতাম। -হুম। জানি। নট আ ফ্যাক্টর। ঠিক হয়ে যাবে। -ওরা আমাদের ফেলে রেখে গেছে। আবার আসবে। -ওহ! আমি এবার শ্রাবনীর বাবার দিকে তাকিয়ে বললাম -এসবের মানে কি চাচা? -ওরা আমার সহকর্মী ছিলো। -তা তো বুঝলাম। কিন্তু আপনি এসব সম্পর্কে আমাকে আগে বলেননি কেন? মনে হয় শ্রাবনীও এ ব্যাপারে জানতে চায়। বলে শ্রাবনীর দিকে চোখ দিয়ে ইঙ্গিত করতেই ও নীরবে সম্মতি জানালো। -আগে বলিনি একারণে যে আমি আমার হারানো অতীতকে আর ফিরে পেতে চাইনি। আমি সব বলতেছি। কিন্তু তার আগে বলো এখানে কিভাবে আর কেন এলে? -আপনাদের পিছন পিছন। কেন এসেছি তা বলতে পারবো না। -ওহ। আচ্ছা শোন। বলেই উনি বলতে শুরু করলেন তার আরেক কাহিনী। -আমি ঢাকার বিজ্ঞান একাডেমি আর প্রত্নতাত্তিক সোসাইটির প্রধান ছিলাম। একদিন আমার কাছে একটা পার্সেল আসে। তাতে একটা খুব প্রাচীন ম্যাপ আর লিপি ছিলো। লিপিটা আমাদের দেশেরই। তবে খুব পুরানো। তাতে ইউটোপিয়ার কথা বলা হয়েছে। আমি ইউটোপিয়ার সন্ধানীদের একজন। আমি ওনার কথায় বাঁধা দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম -ইউটোপিয়া কি? -ইউটোপিয়া হলো একটা মিথ। চির সুখের স্থান। সেখানে কোনো অশান্তি নেই। অন্যান্য প্রাচীন ধর্মের মতে দেবতারা পৃথিবীর কোনো জায়গায় ইউটোপিয়া বানিয়ে গেছেন। যারা জগতের মায়া কাটাতে পারবে তারাই খোঁজ পাবে ইউটোপিয়ার। -তারপর? -তারপর সেই ইউটোপিয়ার কথা বলা হয়েছে ওই পার্সেলটায়। আমি স্বভাবতই আগ্রহী হই। কিন্তু এর খোঁজ সবাইকে জানানো যাবে না। তাতে প্রকৃতির বিরুদ্ধে যাওয়া হবে। তাই আমি গোপনে এর খোঁজ নিতে চেয়েছিলাম। তাই একদিন না জানিয়ে সবাইকে ছেড়ে ডুব দেই। কিন্তু দূর্ভাগ্যক্রমে একদিন রফিক দেখে ফেলে ম্যাপটা। সেই থেকে ও আমার খোঁজ করে। ও সেই পুথি, ম্যাপ বা ইউটোপিয়ার খোঁজ চায় আমার কাছে। আসলে ও লোক ভালো না। ওর হাতে ইউটপিয়ার খোঁজ পড়লে মানব জাতির অসম্ভব ক্ষতি হয়ে যাবে। একশ্বাসে বলে থামলেন ডক্টর মাহমুদ। -হ্যাঁ। বাকিটা আমি জানি। তো খোঁজ পেয়েছিলেন ইউটোপিয়ার? -আপাতত না। এটা একটা রহস্য। প্রতিবছর একটা নির্দিষ্ট সময়েই ইউটোপিয়া মানুষের সামনে আসে। শুধু অল্প কয়েকটা মিনিট। তারপরই মিলিয়ে যায়। এটা আমাদের বঙ্গোপসাগরের ভিতরেই! -কি বলছেন? তারমানে এটার জন্যি আপনি সব কিছু ছেড়ে জেলে হয়ে গিয়েছিলেন? -হুম। কিন্তু শ্রাবনী আসার পর আমি ইউটোপিয়া খোঁজা বাদ দেই। দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেছি। কিন্তু ইউটোপিয়া আমার কাছে ধরা দেয়নি। আমার মিথের দরকার নেই আর। আমি বাস্তব নিয়েই বাঁচতে চাই। ইউটোপিয়ার কথা শুনে আমি অবাক হলাম না। এই একবিংশ শতাব্দিতে শ্রাবনীর মত মেয়ে থাকতে পারলে ইউটোপিয়া থাকবে না কেন! ১৪. বৃষ্টি আগের মতই পড়ছে। আমি এখান থেকে কিভাবে বের হওয়া যায় তার চিন্তা করতে থাকলাম। এ জন্যে প্রথমে হাত পায়ের বাঁধন খোলা লাগবে। কিন্তু আমার নাইফটা পায়ের কাছে। মানে জুতার ভিতরে। সেখানে পৌছাতে পারবে না আমার হাত। আমি চিন্তায় খানিকটা নড়াচড়ার চেষ্টা করলাম। তাতেই আমি একটা উপায় পেয়ে গেলাম। নড়াচড়ার ফলে চেয়ারে কিচকিচ শব্দ হচ্ছে। চেয়ারের দিকে তাকিয়ে দেখলাম অনেক পুরানো। একটু চেষ্টা করলে হয়তো ভাঙতে পারবো। তাই দুইপা দিয়ে প্রথমে একটা ছোট জোড়া লাফ দিলাম। আসলে তাতে কিছু না হয়ে শুধু চেয়ারসহ খানিকটা সামনে এগোলাম। কিন্তু চেয়ারের কিছু হলো না। শ্রাবনী অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি বোকার মতো একটা হাসি দিলাম ওর দিকে তাকিয়ে। আবার চেয়ার ভাঙ্গায় মন দিলাম। কিছুক্ষন লাফালাফির পর আমি কাছের দেয়ালটার কাছে যেতে পারলাম। তারপর অনেক কষ্ট করে দেয়ালে পা একটু একটু করে উঠাতে লাগলাম। ওরা আমার পা চেয়ারের সাথে বাঁধেনি। তাতে একটু সুবিধা পেলাম আমি। সেটাই কাজে লাগাচ্ছি। পা খানিকটা ওঠার পর আমি পা জোড় করে দেয়ালে খুব জোরে ধাক্কা দিলাম। আর খানিকটা ছিটকে উঠেই চেয়ার পিছনের দিকে রেখে পড়ে গেলাম। চেয়ারটা শব্দ করে ভেঙ্গে কয়েক টুকরো হয়ে গেল। আমার হাত আর পিঠ ব্যাথা করতে লাগলো। আমি খানিকটা সময় নিয়ে উঠে বসলাম। তারপর হাতের বাঁধন খুব সহজেই খুলতে পারলাম। হাত খোলা হলে পরে নাইফটা বের করে পায়ের দড়ি কেটে দিলাম। হাত খানিকটা দলে নিলাম। কারণ এতক্ষন বাঁধা থাকার ফলে হাতে ঝিম ধরে গিয়েছে। ভাবতেও পারিনি যে এতো সহজে চেয়ার ভেঙ্গে যাবে। তারপর শ্রাবনী আর ডক্টর মাহমুদকে মুক্ত করলাম। সাগরের পাশের জানালাটা খোলা রেখে গিয়েছে ব্যাটারা। যাতে আলো বাতাসও ঢুকতে পারে আর আমরা পালাতেও না পারি। আমি জানালার কাছে গিয়ে নিচে উকি দিলাম। এক ঝাপটা বৃষ্টিসিক্ত বাতাস আমাকে ভিজিয়ে দিয়ে গেলো। নিচে সাগরের নীল পানিকে এখন ধূসর দেখাচ্ছে। জানালার পর এক ফুটের মত জায়গা। তার পরই ২০ মিটারের নিচে সাগর। আমি যেই ঘুরে দাঁড়াতে যাবো ওমনি পিছন থেকে দরজাটা খুলে। আমি ঘুরে দাঁড়ালাম। দেখলাম ডঃ রফিক তার দলবল নিয়ে এসেছে। আমাদের মুক্ত অবস্থায় দেখেই চোখের পলকে সবাই নিজেদের বন্দুক বের করলো। রফিকের হাতে রিভল্বার আর এক জনের হাতে স্পাস টুয়েল্ভ। -ওহ! কি ব্যাপার? সব ছুটে গেছে তো দেখছি। -আমাদের এভাবে আটকে রাখার কোনো অধিকার নেই আপনার। -কার কিসের অধিকার সেটা পরে বোঝা যাবে। তুমি এখানে গুপ্তচরগিরি করে ধরা পড়েছো। এর জন্য তোমাকে আগেই গুলি করে মারা উচিৎ ছিলো। -ওহ! তাই নাকি? মানুষ মারা এতো সহজ জানতাম না তো। বলতে বলতে আমি ধীরে ধীরে দরজার দিকে আগাতে লাগলাম। ভিতরে এখন তিনজন ওরা। আমি চেষ্টা করতেছি ওদের মনোযোগ অন্যদিকে সরাতে। চোখের কোণা দিয়ে শ্রাবনীকে ইঙ্গিত করলাম দরজার দিকে আগাতে। রফিক মনে হয় বুঝতে পারলো আমি কি করতে চাইছি। তাই তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে দিলো। একটা মধ্যবয়স্ক লোককে বন্দুক হাতে কেমন যেন মানাচ্ছে না। আমার দিকে পিস্তলটা নাচিয়ে বললো -দেখো ছোকরা, কিছু করার চেষ্টা করো না। তাহলেই গুলি খেয়ে মরবে। আর গুলির শব্দ এখান থেকে কেউ শুনতে পারবে না আমরা ছাড়া। তাই বোকামি করো না। তারপর আমাদের দিকে পিস্তল দিয়ে ইঙ্গিত করে এক পাশে জড়ো হতে বললো। আমি আর কোনো উপায় দেখলাম না। যা করতে বলা হলো করলাম। তারপর আবার কথা বলা শুরু করলো। -কি ডিসিশন নিলেন ডক্টর? -আমি সত্যিই বলছি আমি ম্যাপটা সাগরে হারিয়ে ফেলেছি! -উহু। মিথ্যা বলছেন। এই জিনিস নিয়ে আপনি সাগরে যাবেন! মানতে পারলাম না। -তাহলে কিছু করার নেই। আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারবো না। -দেখুন, আপনি নিজ ইচ্ছায় দিলে তো বেঁচে যাবেন। নাহলে কিন্তু এখান থেকে কেউ বেঁচে ফিরতে পারবেন না। বলে রফিক হেঁটে জানালার কাছে গিয়ে বাইরে তাকালো। আর স্পাসওয়ালা লোকটাকে বাইরে অপেক্ষা করতে বললো। আরেকটা সুট পড়া লোক কোনো কথা বলছে না। মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। রফিক অপেক্ষা করতে লাগলো ডক্টর মাহমুদ কি বলেন। কিন্তু উনি কিছুই বললেন না। চুপ করে মাটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাই দেখে রফিকের রাগ হলো। সে একবার আমার দিকে আর একবার শ্রাবনীর দিকে দেখলো। তারপর বললো -ভালো কথায় কাজ হয় না বুঝি! আচ্ছা। কিছু করার নেই তাহলে। এই দুই জনকে মারবো একে একে। আগে মেয়েটাকে দিয়েই শুরু করি। মেয়েদের ইমোশন বেশি। এই বলেই সে যেই রিভল্বার তুলতে গেলো আমি শ্রাবনীর সামনে গিয়ে ওকে আড়াল করে দাঁড়ালাম। বললাম -খবরদার যদি ওর দিকে বন্দুক তুলেছো তো! -কেন কি করবে? যেন খোঁচা মারলো আমাকে। মাথায় আগুন ধরে গেলো আমার। নিজেকে সামলাতে পারলাম না। বুঝতে পারছি হয় ও বাঁচবে নাহলে আমরা বাঁচবো। ক্ষমতার লোভ মানুষকে অন্ধ করে দেয়। রফিক পুরো পাগল হয়ে গেছে মনে হলো। কিন্তু শ্রাবনীদের বাঁচাতে হলে আমি সামনে একটাই উপায় দেখতে পাচ্ছি। রফিক জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। যেটার ওপারেই সাগরের মৃত্যু ফাঁদ। ওকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে পারলেই হবে। আর আমি এখন সেটাই করতে যাচ্ছি। আমি রফিককে বললাম -ওদের ছেড়ে দাও। যা করার আমার সাথে করো। -তা কি করে হয়? তুমিতো এখনো কচি খোকা! বলেই হাহা করে ঘর কাঁপিয়ে হাসতে লাগলো। আমার রাগ ক্রমশ বাড়ছে ওর এই স্পর্ধা দেখে। আবার শ্রাবনীর দিকে বন্দুক তুলে ধরলো। বুঝলাম সময় হয়ে এসেছে। আমি কোনাকুনি ভাবে ওর দিকে দৌড় দিলাম। কিন্তু তার আগেই ঘর কেপে উঠলো বিকট একটা শব্দে। আমি মাটিতে বসে পড়লাম। আমার পেটে গুলি করা হয়েছে। চোখের সামনে এক সেকেন্ডের জন্য অন্ধকার হয়ে গেল। গরম কিছু অনুভব করলাম হাতের তালুতে। দেখলাম আমার পেটে চেপে ধরা হাত রক্তে ভিজে যাচ্ছে। এড্রেনালিনের প্রভাবে ব্যাথা তেমন অনুভব করলাম না। কিন্তু চারদিক ঘোলা হয়ে আসছে আমার। অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়ালাম। শ্রাবনী মাথায় হাত দিয়ে বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি ওর দিকে তাকিয়ে অনেক কষ্টে বললাম -যদি বেঁচে থাকো তো জেনে রেখো একটা ছেলে তোমাকে ভালবেসেছিলো… আমি তোমাকে ভালোবাসি লাল চোখের মায়াবতী! বলেই আমি ঝাঁপ দিলাম রফিকের উপর। রফিক কিছুই বুঝতে পারলো না। একবারে রফিককে নিয়ে আমি জানালা গলে নিচে উত্তাল সমুদ্রের দিকে পড়তে শুরু করলাম। তীব্র বাতাস আর বৃষ্টির ছাট লাগলো গায়ে। রফিককে জড়িয়ে ধরে রেখেছি। এখন অপেক্ষার পালা। ক্ষুদ্র কয়েকটা মুহুর্তকে কয়েক যোজন মনে হচ্ছে। অবশেষে এক তীব্র ধাক্কা। আমার চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেল। …………………………… সাগরতীরে একটা দেহকে কোলে নিয়ে বসে আছে শ্রাবনী নামের মেয়েটি। দমকে দমকে কেঁদে চলেছে। তার পাশে একজন বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে। তার কিছু বলার ভাষা নেই শ্রাবনীকে। সে আজ পরাজিত। পরাজিত শ্রাবনীও। ওর ক্ষমতাও পারবে না আরিয়ানকে ফিরিয়ে আনতে। সে এখন চলে গিয়েছে দূর পৃথিবীর ডাকে। শ্রাবনীর সেই কান্না শুনতে পাবে না আর ছেলেটি, অশ্রু মুছিয়ে দেবে না। হয়তো কেউ আর তাকে ডকবে না লাল চোখের মায়াবতী বলে…।। সমাপ্ত।