
Story
জোছনা ও চাঁদের গল্প
-লাভ নাই......কথাটা শুনে বেশ খানিকটা চমকে আমার মুখের দিকে তাকাল ফাবিয়া। তার বাদামি চোখ দুটায় নিখাদ দুঃখ দেখতে পেলাম।
-তুই এত রাতে ছাদে ট্যাংকীর উপর কি করিস? ফাবিয়া চোখের পানি গোপন করে বলল।
-তারা গোনার ব্যার্থ চেষ্টায় আছি আর তোর বলদামি দেখতেছি।
-আমি কি করলাম? আর লাভ নাই বললি ক্যান?
-এই তিনতলার উপর দিয়ে লাফ দিলে তো আর মরবি না...... খালি খালি অনেক ব্যাথা পাবি। দ্বিতীয় বারের মত চমকে উটল।
-তার চেয়ে আমি সায়ানাইড আইনা দেই ওইটা খাইয়া মর।
এইটা শুনে ও একবার আমার দিকে তাকাল আর একবার ছাদের নিচে তাকাল। তারপর আর চোখের পানি আটকে রাখতে পারল না। আঝর ধারায় কেঁদে চলল। কি আর করা, আমি নিচে নেমে আসলাম। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললাম
-কাঁদে না, পাগলি। সুইসাইড করলেই কোন ঘটনার সমাধান হয় না আর দুঃখ থেকেও মুক্তি পাওয়া যায় না। আমার বুকে মাথা রেখে হু হু করে কেঁদে উটল ও। ওর জীবনে অনেক দুঃখ। আমি জানতাম। তাই বন্ধু হয়ে সব সময় ওর পাশে থেকেছি। কোনদিন বাবা মায়ের অভাব বুজতে দেইনি। ওর বাবা মা মারা যাওয়ার পর মামার বাড়িতে থাকে। ওর মামা মামি ওকে দু চোখে দেখতে পারে না। যদিও ওর নিজের বাসায় তারা থাকে। আমি ওর বন্ধু হওয়ার পর এই দুই বছর ধরে ওকে আগলে রাখছি। সবসময় উৎসাহ দিয়েছি, বেঁচে থাকার প্রেরনা দিয়েছি। কিন্তু আজকে মনে হয় গুরুতর কিছু হয়েছে। যাই হোক... ওইটা জানতে চাইলাম না।
-চল ফাবিয়া, আজকে তোকে কিছু জিনিস দেখাব।
-কি?
-আরে চল না। বলেই ওর হাত ধরে টেনে নিচে আমাদের পুকুর ঘাটে নিয়ে আসলাম। নিচে যেতে যেতে ওর সাথে দেখা হওয়ার প্রথম দিনটার কথা মনে পরে গেলো। আমি হারিয়ে গেলাম অতীতের স্মৃতিতে
ঘটনাটা ঘটেছিল আকস্মিক ভাবেই।
ওইদিন উত্তেজনার ফলে আমার চুল মনে হয় খাড়া হয়ে গিয়েছিল যদিও আমি তা দেখতে পারছিলাম না। যার সামনে এতদিন নিজের বীরত্ব জাহির করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছি ওইদিন তা আপনাআপনিই হয়ে গেলো। কিন্তু সে এটাকে আমার বেয়াদবি হিসেবে নিয়েছে। ঘটনাটা হল আমি সেদিন পড়া শেষ করে বাসায় আসতে ছিলাম। সাইকেলটা খুব জোরেই চালাচ্ছিলাম। বাসার সামনে এসেছি, এমন সময় হঠাৎ করে সে একটা চিকন গলি দিয়ে আমার সাইকেল এর সামনে এসে দাঁড়ালো। আমিও ভুলে সামনের হার্ডব্রেক দিলাম। যার ফলে তার প্রায় একফুট সামনে আমার সাইকেলটা থেমে গেল এবং সাইকেলের পিছনের চাকা প্রায় দুইফুটের মত উপরে উঠে গেল। আর একটু হলেই তার গায়ের উপর গিয়ে পরতাম। আমি তাকে কিছু বলার আগেই সে ধমক দিয়ে উটলো
-এই বেয়াদব ছেলে, এইভাবে কেউ সাইকেল চালায়!
আমি
–আজিব তো! তুমিই তো হঠাৎ করে আমার সামনে এসে পরছো। ভাগ্য ভাল যে আমি সময় মত ব্রেক করছি।
-কি? এখন আমার দোষ! দাড়াও লোকজন ডাকছি। মেয়েদের সামনে এসে স্ট্যান্ট দেখানো হচ্ছে, না?!
আমি পুরাই ভড়কে গেলাম। দেখলাম পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। সামাল দেয়ার জন্য আমাকে বাধ্য হয়ে বলতেই হল যে ওইটা আমার দোষ। স্যরি বলে পাশ দিয়ে যেতেই পিছন থেকে ডাক দিলো,
-এই যে স্ট্যান্টম্যান, তোমার বোতল পরে গেছে। এই নাও। বলেই আমাকে বোতলটা দিলো। ওইটা হাতে নিয়ে ধন্যবাদ জানাতে মুখের দিকে তাকালাম। দেখলাম মিটিমিটি হাসছে। আমি ওকে খুব পছন্দ করলেও নাম জানতাম না। তাই এই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে বললাম
–থ্যাঙ্কস। তা তোমার নামটা জানতে পারি?
-হুম। ফাবিয়া।
-কি? ফোবিয়া?
-আরে নাহ। ফাবিয়া। বই পড়ে বিদ্যা ফলানো হচ্ছে খুব! মাথা ঝাঁকিয়ে ভুরু কুচকে বলল। টোল পরা হাসিটা এখন লেগে আছে মুখে।
-আমি যে বই পড়ি এইটা জানলা কিভাবে?
-ওইদিন তোমাকে লাইব্রেরীতে দেখেছিলাম।
-ও আচ্ছা। আমি...... নিজের নাম বলতে যাচ্ছিলাম,
-আমি জানি তুমি আরিয়ান। সাবধানে সাইকেল চালিয়ো।...... এই বলেই হুট করে চলে গেল। তার এই অদ্ভুত আচরনের বিন্দুমাত্রও বুজতে পারলাম না।
সেদিনের পর একদিন লাইব্রেরিতে দেখা তার সাথে। কথা হল, পরিচিত হলাম ভাল করে। তারপর বই এর ছুতায় ওর সাথে দেখা করার জন্য ওর বাসায় যেতাম। এভাবেই ওর সাথে বন্ধুত্ব শুরু হয়। একই পাড়ায় বাসা হওয়ায় এবং আমার বাবা পুলিশের অফিসার থাকায় ওর মামা-মামি আমাকে একটু সমীহ করে চলত। মেয়েটা খুবই একা ছিল। আমাকে পাওয়ার পর থেকে মনে হয় ও নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে।
একরাতের কথা। রাত প্রায় ১ টা বাজে। আমি খাটের উপর বসে জানালায় হেলান দিয়ে গান শুনতেছি। এমন সময় জানালা দিয়ে কে যেন আমাকে ডাক দিলো। আমি ঘাড় ফিরিয়ে দেখতেই ভুত দেখার মত চমকে উটলাম। দেখলাম ফাবিয়া সানসেট এর উপর দাড়িয়ে আছে গ্রিল ধরে। ভয়ে তো আমার হার্ট খুলে যাওয়ার উপক্রম হল। দেখলাম সে চাঁপা হাসি হাসছে।
-ক...ক কিরে, তুই এত রাত্রে এইখানে!
-হেহেহে, হুম।
-ক্যামনে উটলি?
-মই দিয়ে! (আমি দোতালায় থাকি)
-আও!
-ক্যান ভয় পাইছিস?
-পাগলকে তো ভয় পাবো ই।
-পাগলামি আভি বাকি হ্যা মেরে দোস্ত!
-কি চাস?
-ছাদে চল।
-আমারে কি ভুতে কামড়ায় যে এত রাতে ছাদে যাব!
-আরে চল না......নাইলে কিন্তু ঘুমাতে দিব না। কি আর করা। বাধ্য হয়েই যেতে হল। চুপেচাপে কোনও মতে ছাদে উটলাম। মাতাল করা জোছনা উঠেছিল। কিছুক্ষন নির্বাক হয়ে বসে ছিলাম। পরে জানলাম দেখাতেই আমাকে ডেকেছে। ওই রাতে অনেক কথা হল। হঠাৎ বলল
-সিগারেট খাবি? আমি আবারও টাসকি খেলাম।
-কি! তুই সিগারেট পাইলি কই?!
-মামার প্যাকেট থেকে চুরি করছি। কি আর বলব, অধিক শোকে কংক্রিট হয়ে বসে ছিলাম।
পুকুর পাড়ে এসে গিয়েছি। নিজেকে জোর করে বাস্তবে ফিরিয়ে আনলাম। ওর সাথে থেকে আমিও কিছুটা অদ্ভুত হয়ে গেছি। আজও ভরা জোছনা। তাকে নিয়ে ঘাটে বসলাম।
-ফাবিয়া, পুকুরের পানিতে তাকাও। কি দেখতে পেলে?
-চাঁদের প্রতিচ্ছবি।
-তুমিও যে আমার জীবনের প্রতিচ্ছবি। চাঁদের দিকে তাকাও। কি মনে হয়?
-পৃথিবীকে অন্ধকারে আলোকিত করছে।
-তুমিও আমার জীবনকে আলোকিত করেছ। আমিও হয়ত একদিন আজকে তোমার মত জীবনের শেষ প্রান্তে ছিলাম। তুমিই তো আমাকে নতুন জীবন দিয়েছিলে। পুকুরের পানিতে নাড়া দিয়ে বললাম,
-তুই চলে গেলে আমার জীবনটাও তো এমন হয়ে যাবে। তখন কে আর আমার সাথে পাগলামি করবে? কে আমার খাবার, বই এ ভাগ বসাবে? আর অন্যকিছু না হোক তোকে আমার জন্য বাঁচতে হবে। এই বন্ধুটার হাত ধরে আরও পথ চলতে হবে। ধরবি এই হাত? বলে হাতটা এগিয়ে দিলাম। অশ্রুমাখা মুখটি যেন আধোঅন্ধকারে আলো ছড়াচ্ছিল। চোখের পানি মুছে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
-তুই এমন ক্যান?
-বল, আমাকে ছেড়ে যাবি না।
-হুম বলেই কম্পিত হাতে আমার হাতটা ধরলো।
যে ধরার মাঝে আছে বিশ্বাস, বন্ধুত্ব এবং অনেকখানি ভালবাসা
সমাপ্ত।