ফিরে পাওয়া
অনেকদিন ধরে আমার ৬ বছরের মেয়েটা আবদার করতেছে ওকে নিয়ে বাইরে ঘুরে আসতে। তাই আজকে ওকে নিয়ে শিশুপার্ক থেকে ঘুরে এসে মুক্তিযোদ্ধা পার্কে আসলাম নদী দেখাতে। আসলে শহরে থাকলেও নদী দেখা হয়নি ওর। তাই নদী দেখে ওর লাফালাফি ঝাপাঝাপি বহুগুণ বেড়ে গেল। তাইতো গাড়ি থেকে নেমেই দিলো এক দৌড়। আমি ধীরেসুস্থে নেমে ওকে দেখতে লাগলাম আর একটি গাছের ছায়ায় গিয়ে বসলাম। আমি ওকে বললাম
-বেশি কাছে যেও না মামনী... ভিজে যাবে তাহলে।
-আচ্ছা বাবা।
বলেই খিলখিল করে হেসে উঠলো। আমি তো বললাম মাত্র। কিন্তু কে শোনে কার কথা! একদৌড়ে নদীর তীরে গিয়ে পানিতে পা ডুবালো। তারপর সে কি দুষ্টামি! বালু খুড়ে গর্ত করা, বালু ছোড়াছুড়ি করা, পানিতে দৌড়াদৌড়ি করা, কি বাকি নেই! আমিও মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছি আমার ছোট্ট মেয়েটার দিকে। মনে পরে গেল দূরন্ত মেয়েটাকে পাবার ঘটনাটা।
মনে হলো যেন এইতো সেদিনের ঘটনা। আমি আমার নতুন চাকরির কাজ শেষ করে করে সন্ধার সময় ঘরে ফিরছিলাম হেঁটে হেঁটে। রাস্তায় দেখি একজায়গায় একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে। একটা পরিবার রাস্তা পেরোতে গিয়ে গাড়ি চাপা পড়েছে। সবাই মারা গেছে। কিন্তু এক মহিলা তখনো বেচেঁ ছিলেন। আমি কাছে গিয়ে দাড়াতেই দেখলাম মায়ের কোলে একটা বাচ্চা কাঁদতেছে। অনেক কষ্টে চোখ খুলতেই তিনি আমাকে দেখতে পেলেন আর বলে গেলেন তার বাচ্চাটাকে দেখে রাখতে। তারপরই তিনি মারা গেলেন। আমি বাচ্চাটাকে হাতে নিয়ে বিধ্বস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। সাথে অবাক হয়ে গেলাম এতটুকু বাচ্চাটা কিভাবে বেঁচে রইলো!
তারপর কেউ কিছু বলার আগেই চুপচাপ বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করলাম। আমি ছোট থেকেই মা বাবাকে হারিয়েছিলাম। তাই একাই বড় হই আর থাকতাম একটা ফ্লাটে। বাবার জমানো টাকা দিয়েই বড় হই আর পড়াশোনা শেষ করি। তখন চাকরি পেয়ে নিজেই নিজের জীবন চালাতে শিখলাম |
তাই তখনও আমি একা ছিলাম। বাচ্চাটা হাতে নিয়ে আমি রুমের মধ্যে খাটের উপর বসে আছি। চিন্তা করতেছি ওকে নিয়ে কি করবো। অনাথ আশ্রমে দিলে তো খুব কষ্টে থাকবে। আমার কোলের মধ্যে গুটি মেরে শুয়ে আছে নিশ্চিন্তে। দেখে খুব মায়া লাগলো। আসলে একা থেকে কারো অভাব খুব স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছি। আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম। মেয়েটা আমার কাছে থাকবে। যা থাকে কপালে। তারপরের কাহিনী অনেক জটিল। একটা বাচ্চা একা ছেলের জন্য বড় করা যে কি ঝামেলার ও কষ্টের তা আমার চেয়ে কেউ জানে না। ওর জন্য আমি পরে বড় বাড়ি বানাই। আজও তাতে আমরা বাবা ও মেয়ে দুজনেই থাকছি।
আমি বেঞ্চে বসে বসে অরনীর দুষ্টামি দেখছি। হঠাৎ আমার কাধে টোকা দিলো কে যেন। আমি ফিরে তাকাতেই ভয়ানক চমকে উঠলাম। এলিকা দাঁড়িয়ে আছে আমার পিছনে। ঠিক আগের মতোই আছে দেখতে। নীল শাড়িতে একটুও বদলায়নি। এলিকা আমার জীবনের প্রথম ও শেষ মেয়ে ছিলো যাকে আমি ভালোবেসেছিলাম।
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম
-কি বেপার? এতোদিন পর?
-হুম। চিনতে পেরেছো তাহলে।
-হ্যাঁ। কেমন আছো?
-ভালো... তুমি?
-জানি না।
-একা এসেছো?
-না। সাথে আমার মেয়ে আছে।
-ও। বলেই এলিকা কেমন যেন মন খারাপ করে ফেলে। আমি অরনীকে ডাক দিলাম।
-মামনী, দেখে যাও কে এসেছে!
-এইটা কে বাবা?
-তোমার এক আন্টি হয়। এলিকা, এ আমার মেয়ে অরনী।
-ওমা! কি কিউট মেয়ে! এলিকা অরণীর গালে আদর করে বললো।
-তুমিও এত্তোগুলা কিউট আন্টি।
-তুমি কি কর বাবু?
-আমি সারাদিন খেলি আর দিনের শেষে বাবার কোলে ঘুমাই।
-তোমার বাবা কি করে?
-বাবা তো সারাদিন পচা খায়।
-মানে?!
-ওই যে আছে না! আগুন জ্বালিয়ে খায়!
-ও আচ্ছা। বুঝেছি দুষ্টু মেয়ে। তা তোমার আম্মু কিছু বলে না তোমার বাবাকে?
-আমার আম্মু নেই তো।
-ও আচ্ছা ..স্যরি। আমি জানতাম না। বললো এলিকা।
আমি অরনীর কথা শুনে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলাম।
জানি না এলিকা কি ভাবলো! কিন্তু আমি ওকে জানালাম না যে আমিতো বিয়ে করিনি।
আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম
-বিয়ে করেছো?
-না।
-ও আচ্ছা।
-হুম। যাই ফিহা। ভালো থেকো। বলেই ও চলে গেল। আমি আর ওকে আটকালাম না। কারণ এখনো আমার বুকে রয়েছে ওর ই তৈরি করা এক দগদগে ঘা।
তখন আমরা ভার্সিটিতে পারতাম। প্রথম দেখাতেই আমি ওর প্রেমে পড়ি। একা থাকার কারণে ভালবাসা নামক অনুভূতি আমি কখনো পাইনি। তাই আমি দিনদিন ওর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ি। কবে কিভাবে যে আমাদের প্রেম হয়ে গেল টের ই পেলাম না। আমি ওর মত ধনী ছিলাম না। ও এসব নিয়ে কখনো কথা বলতো না। কিন্তু একদিন সব পাল্টে গেল। ব্রেকআপের কয়েকদিন আগে থেকেই ও বদলে যেতে লাগলো। কেমন যেন মনমরা আর উদাসী হয়ে গেল। অবশেষে একদিন শেষ বিকেলের আলোয় ও আমার মন ভাংলো। ওর শেষ কথা ছিলো .."তোমার আমার বাবার মত সমাজে স্ট্যাটাস নেই। তুমি কোনো দিনও তা করতে পারবে না। স্যরি ফিহা , আমি তোমার সাথে আর সম্পর্ক রাখতে পারবো না। তুমি নিজের পথ দেখো আর আমি আমারটা" তার কিছুদিন পর ই ও বিদেশে চলে গেল।
আমি আজ অবাক হয়ে ভাবতেছিলাম পুরোনো দিনের কথা পার্কের বেঞ্চে বসে। সেই দিনের পর আমি নিজেকে শক্ত করলাম। নিজের অদম্য চেষ্টায় ও ইচ্ছায় আজ আমি সমাজের অন্যতম গণমান্য ব্যাক্তি। যা এলিকার বাবার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। কিন্তু আমি ওকে এগুলো কিছুই বললাম না। কারণ আমি এখনো ওকে ভালবাসি।
হঠাৎ আমার মোবাইলে একটা মেসেজ আসলো। সেখানে লেখা "আমার ক্যান্সার হয়েছিল। অবস্থা খুব খারাপ ছিলো তখন। তাই আমাকে চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যেতে হয়। আমি চাইনি যে আমার কারণে তোমার লাইফটা নষ্ট হোক। তাই তোমাকে নিজের পায়ে হওয়ার জন্য আমি ওই কথাগুলো বলেছিলাম। আল্লাহর অসীম রহমতে আজ আমি সুস্থ। পারলে আমাকে মাফ করে দিও। -এলিকা।"
আমি মেসেজটা পরে তব্দা খেয়ে বসে রইলাম।
আমার হৃদয় ডুকরে বেজে উঠলো। আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। তাই অরনীকে নিয়ে এক ছুট দিলাম এলিকা যেদিকে গেল ঐদিকে। কিন্তু ওকে কোথাও খুঁজে পেলাম না। হঠাৎ মনে পরলো আমাদের প্রিয় জায়গাটার কথা। তারাতারি ঐখানে যেতেই দেখলাম আমাদের প্রিয় স্থানে এলিকা বসে আছে। আমি ওর সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসলাম .. অরনী আমার কোলে। এলিকাকে বললাম
-ইয়ে, মানে তু....তু.. তুমি কি আমার মেয়ের মা হবে?!
-কিন্তু তুমিতো .....
-নাহ... বাবা বিয়ে করেনি। আন্টি, শুধু তোমার জন্য অপেক্ষা করে গেছে সারাজীবন। বললো অরনী।
-তাহলে তুমি? .. ও আচ্ছা। বুঝতে পেরেছি। তুমি কি বলো মিষ্টি মেয়ে?
-আসোনা আন্টি প্লিজ। আমি আর তুমি সারাদিন খেলবো। বলেই অরনী ওর টোল পরা হাসিটা দিলো।
আমি অবাক হয়ে গেলাম এতটুকু একটা মেয়ের অনুভূতির প্রকাশ দেখে। ও তো শুধু মুখে বললো খেলার কথা। কিন্তু আমি জানি এর পিছনে কত বড় কষ্ট লুকিয়ে আছে ওর। আমি ওকে নিজের সন্তানের মত ভালোবাসলেও ওর মায়ের অভাব পূরণ করতে পারিনি। অরনীও আমাকে ভালবাসে বলে ওই বেপারে কোনোদিন কিছু বলেনি।
-এলিকা, তোমার অসুখের বেপারে আমাকে কিছু বলনি কেন? একটু রাগ হয়েই জিজ্ঞেস করলাম।
-কেন? জানালে তুমি কি করতে?
-তোমার সাথে থাকতাম। ছেড়ে যেতাম না।
-হুহ ...
-তা এতো বছর পর ফিরে এলে কেন?
-তোমাকে ভালোবাসি বলে। সোজাসাপ্টা উত্তর দিলো।
আমি আর কিছু বললাম না। এলিকা তখন এলিকা অরনীকে জিজ্ঞেস করলো
-মামণী... চকলেট খাবে?
-হুম আন্টি! খাবো!
-উহু ..! আন্টি না.. আম্মু বলো।
-আন্টি .. স্যরি আম্মু তুমি এত্তোগুলা ভালো! বলেই অরনী এলিকাকে জড়িয়ে ধরলো।
কি! শুনে আমার মনটা আনন্দে নেচে উঠলো। এলিকাকে বললাম
-ইয়ে মানে, আমাকে চকলেট দিবে না!
-কি! তুমি এতো বড় বুড়া ধামড়া হয়ে বাচ্চাদের চকলেট খেতে চাও?
-তাহলে কি খেতে দিবে?
-তুমি কি খেতে চাও?
-তোমার লিপিস্টিক!
-কি বললে? এলিকা চোখ পাকিয়ে বললো।
-নাহ কিছু না! আমি আমতা আমতা করতে থাকি।
-যাও শয়তান! তোমার সাথে আর কথা নাই। আমি আমার বাবুকে নিয়ে চলে গেলাম!
বলেই ও অরনীর হাত ধরে হেঁটে চলে যেতে লাগলো। আমি খানিকক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম মা মেয়ের নিষ্ঠুরতা দেখে। তারপর ঝেড়ে দৌড় দিলাম। একবার হারিয়েছি আমার ভালবাসা। আরেকবার হারাতে চাই না ......।।
সমাপ্ত