
ড্রাঙ্কেন মুন
১.
২৫ মার্চের রাত ১১.৩০ টা। আমরা চারজন আমাদের ল্যাবের টেবিলটা ঘিরে দাঁড়িয়ে আছি। আমি, নিমা, অলক আর সান্দ্রা মিলে আমাদের সব গ্যাজেটস আর প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো শেষবারের মতো চেক করে দেখছি। একটু ভুল হলে অনেক বড় ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা আছে। এতদিনের গবেষণা কিছুতেই ভণ্ডুল হতে দেয়া যাবে না। আমি সবকিছু দেখে ওদের দিকে তাকালাম। সবার চোখেই উত্তেজনার স্পষ্ট ছাপ। শুধু সান্দ্রাকে একটু চিন্তিত দেখাচ্ছে। আমি হাত দিয়ে টেবিলে টোকা মেরে সবার দৃষ্টি আকর্ষন করে বললাম…
-তোরা এখনও শিওর যে এটা করতে চাচ্ছিস?
অলক মাথা নেড়ে বলল
-হুম।
-এতে কিন্তু আমাদের ফিরে না আসার চান্স খুব বেশি।
-আমরা জানি। … সান্দ্রার দৃঢ় উত্তর।
-আচ্ছা,তাহলে আমরা এখন শুরু করতে পারি।
আমরা ইনফ্রারেড গগলস পড়ে নিলাম। অতঃপর আমি হাতে স্বর্ণ-ফলকটা নিয়ে সামনে এগোলাম।
২.
ঘটনার শুরু হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ১৯ বছর আগে। আমরা তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। মানুষের জীবনে অনেক চাওয়া পাওয়া থাকে। সেই চাওয়া পাওয়ার সাধারণ জীবনে যদি হঠাৎ করে অস্বাভাবিক কিছু হয়ে পড়ে তখন জীবনটাই বদলে যায়। আমাদের সাথেও এমনটাই হয়েছিল। তখন বরিশাল আজকের মত এতো উন্নত ছিল না। তখন অধিকাংশ স্থানই জঙ্গল আর নালায় ভরা ছিল। আমি আমার দাদাবাড়িতে বড় হয়েছি। সেখানের স্কুলেই পড়াশোনা আর ওদের তিনজনকে বন্ধু হিসেবে পেয়েছিলাম। আজও অবধি আমাদের বন্ধুত্ত মলিন হয়নি।
একদিন স্কুলের ক্লাস শেষে আমি বাসায় ফিরেছিলাম। কিশোর বয়সে মাথায় নানা রকম চিন্তা ভাবনা উদিত হত। তারই এক বাস্তব প্রয়োগের কারণে আমি, নিমা আর অলক আমার বাসার পিছনে জড়ো হলাম। আমার দাদাবাড়ি ছোটখাটো এক রাজপ্রাসাদ। কারণ আমার দাদার দাদা জমিদার ছিলেন। সেই জমিদারি ভবনের পিছনে আমরা তিনজনে মিলে মাটি খুঁড়তে লাগলাম। উদ্দেশ্য ছিলো ছোট এক পুকুর বানাবো যেখানে আমরা মাছ পালতে পারবো। মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে অলকের শাবল একটা একটা পাথরে বাড়ি খেল। আমরা পুকুর বানানোর জন্য পাথরটা উঠাতে চাইলাম। কিন্তু খানিক্ষন পরে বুঝলাম ওটা সাধারন ইট পাথরের চেয়ে একটু বড়। অনেক চেষ্টা করার পর আমি পাথরটা মাটি থেকে তুলতে পেরেছিলাম। কাঁদামাটি লেগে খুব বাজে দেখাচ্ছিলো। আর অনেক ভারী ছিলো পাথরটা। আমরা তিনজনে একসাথে ধরে ওটা খানিকটা দূরে ফেলে রেখে আবার খোড়াখুড়িতে মন দিয়েছিলাম। হঠাৎ চোখে আলোর ঝলকানি লাগতে লাগলো আমার। ওরাও ব্যাপারটা খেয়াল করলো। আলোক উৎসের সন্ধানে এদিক সেদিক তাকাতেই দেখলাম গাছের ফাঁকা দিয়ে আমাদের সদ্য পাওয়া পাথরটার উপর আলো পড়ছে আর তাতে প্রতিফলিত হয়ে আমার চোখে লেগেছে।
কৌতুহলি হয়ে কাছে গিয়ে দেখলাম পাথরটার এক জায়গায় ময়লা উঠে গিয়েছে আর সেখানে সোনালি আভা দেখা যাচ্ছে। তাই তাড়াতাড়ি পানি এনে ধুঁয়ে ফেলতেই আবিষ্কার করলাম পাথরটার এক পাশ পুরো সোনালি রঙ। পরে অবশ্য জেনেছিলাম জিনিসটা সোনা। সেই কিশোর বয়সে এর চেয়ে বড় রোমাঞ্চ আমাদের আর কিছুই ছিলো না। গুপ্তধন আবিষ্কারের উন্মাদনায় সেদিন আমরা রাতে ঘুমাতে পারিনি। পাথরটা লুকিয়েছিলাম আমাদের গোপন খেলাঘরে। পরদিন সান্দ্রাকে ডেকে আমরা পাথরটা দেখিয়ে সবাই কসম করেছিলাম পাথরটার কথা কাউকে বলবো না। সবার বাসা কাছাকাছি হওয়াতে প্রায় প্রতিদিনই সবাই মিলে পাথরটা নিয়ে জল্পনা কল্পনা করতাম। পাথরটা একটি আয়তাকার ঘনবস্তু যার উপরের অর্ধেক সোনায় ঢাকা ছিলো। পরে ভালো করে পরিষ্কার করার পর তাতে কিছু নকশা আর অদ্ভুত ধরনের লেখা খুঁজে পাই সোনার উপরে। সেদিন সবাই সিদ্ধান্ত নেই রহস্যের সমাধান করবো। আমার বাবার বিশাল লাইব্রেরির অ্যাডভেঞ্চারের বইগুলো আমাদের সেই প্রেরণা যুগিয়েছিল।
ক্লাস টেনে উঠে সবাই বুঝতে পারলাম পাথরটার মহত্ব। এটা একটা প্রস্তর ফলক। প্রস্তর ফলক হলো প্রাচীন কালের রাজা-বাদশাদের আদেশনামা বা কোনো গুরুত্ত্বপূর্ণ ঘটনার লিখিত বিবরণ। যদিও কিছুই বুঝতাম না কিন্তু একটা প্রেরণা ছিল একদিন হয়তো একদিন সমাধান করতে পারবো। ততদিনে অবশ্য ফলকটার নিরাপত্তা হাজার গুণ বাড়ানো হয়েছিল। যুগের কালক্রমে হাতে ইন্টারনেট আসলো আর আমরাও আধুনিক হতে শুরু করলাম। সবাই সচ্ছল পরিবার আর মেধাবী হওয়ার কারণে আমাদের ইচ্ছানুযায়ী পরবর্তী কর্তব্য বুঝে নিতে অসুবিধা হলো না। ইন্টার পাশের পর আমি ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং এ, সান্দ্রা কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং, অলক প্রাচীন ভাষাশিক্ষা আর নিমা প্রত্নতত্ত্ববিদ্যা তে ভর্তি হয়েছিলাম। এখন আমরা জব করা শুরু করেছি সবাই।
৩.
এবছর আমরা জব করার পাশাপাশি প্রস্তর ফলকটির উপর কাজ করতে শুরু করলাম। ঢাকায় একটা ফ্ল্যাট কিনে নিয়ে তাতেই নিজেদের ল্যাবরেটরি বানালাম। আমাদের কাজ করতে হতো খুব সাবধানে। কারণ এব্যাপারে কোনো কিছু ফাঁস হলে মিডিয়া বা সরকার সেটা নিজের কুক্ষিগত করবেই।
সবার প্রথমে ফলকটির বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে ছবি তুলে আলাদা করে রাখলাম। পেন্সিল স্কেচের সাহায্যে পাতের লেখা কাগজে ফুটিয়ে তোলা হল। সোনা অক্ষয় ধাতু। তাই প্রাচীন সোনার তৈরি মুদ্রায় আজও সেই যুগের অবস্থার ধারণা পাওয়া যায়। মাটির চাপে ফলকের লেখা ও নকশা খানিকটা থেৎলে গেলেও সিংহ ভাগ আজও অক্ষত আছে।
নিমা পাতটি নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছিল ইন্টারনেটে। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। ও কোনো তথ্যই পায়নি ওটার সম্পর্কে কোনো বই বা ওয়েবসাইটে। আমি একটা ইনফ্রাসনিক স্ক্যানার বানিয়ে পাতটা স্ক্যান করে একটা থ্রিডি ফুটেজ বানালাম। তাতে একটা সুবিধাও হয়েছে। পাতের লেখা, নকশার পাশাপাশি একটা চাবি দেখতে পেয়েছিলাম। স্ক্যান না করলে হয়তো এর ভিতরের লুকিয়ে রাখা চাবিটাও পেতাম না।
ওদিকে অলক আর সান্দ্রা মিলে লেখাটার পাঠ উদ্ধারের চেষ্টা করেছিল। অলকের সাহায্যে সান্দ্রা একটি আনুমানিক সাইন-ল্যাঙ্গুয়েজ এর ট্রান্সলেটর বানায় যেটার সাহায্যে আমরা লেখাটার খানিকটা অর্থ বের করতে পেরেছিলাম। সোনার উপর লেখা ছিল---
“অশোক্য এবং নয়, মাতাল চন্দ্রের নবম তিথি। ভূধরের টান, কম্পমান ষিষট্টি পাঁচ। পরিভ্রমণ ভয়ংকর। রক্ষক সাবধান!”
প্রথমে মনে হয়েছিল কথাটার আগামাথা কিছুই নেই অথবা অনুবাদ ভুল। কিন্তু নিমা জানালো সম্রাট অশোক এই ভারতীয় উপমহাদেশের রাজা ছিলেন। খ্রীষ্টপূর্ব ৩০৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন সম্রাট অশোক মৌর্য্য। একটা মিথ আছে যে সম্রাট অশোক বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা নেয়ার পরপরই গঠন করলেন ৯ সদস্যের একটি দল- পৃথিবীর ইতিহাসের সবচাইতে গোপন। যাদের দায়িত্ব ছিলো জ্ঞান সংগ্রহ করে তা সংরক্ষণ করা। তাও এমন সব জ্ঞান যা সাধারণ মানুষের কাছে বা ভুল মানুষের হাতে গেলে তা হতে পারে মানবসভ্যতার জন্য হুমকি। নয়জনে লিখলেন নয়টি বই। যাতে কুক্ষিগত করা হলো কিছু বিদ্যা। বিষয় নয়টি হল প্রপাগান্ডা ও সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার, ফিজিওলজি, মাইক্রোবায়োলজি, আলকেমি, কমিউনিকেশন, গ্র্যাভিটেশন, কসমোলজি, লাইট, সোশিওলোজি।
এবার মাতাল চন্দ্রের কথায় আশা যাক। মাতাল চন্দ্র বা ড্রাঙ্কেন মুন নামে গুগলে সার্চ দিয়ে জানতে পেরেছিলাম। এখন অবশ্য একে ব্লাডি মুন বলা হয়। চাঁদ ও সূর্যে যখন গ্রহন লাগে অর্থাৎ নিজ কক্ষপথে আবর্তন কালে সূর্য ও চাঁদের মাঝে যখন পৃথিবী চলে আসে তখন চাঁদ পৃথিবীর কারণে অন্ধকারে থাকে। কিন্তু মাঝে মাঝে এর ব্যাতিক্রম হয়। কিছু কিছু তিথিতে চন্দ্রগ্রহণের সময় সূর্যের আলো দ্বারা পৃথিবীকে ঘিরে আলোক রিং এর সৃষ্টি হয়। সূর্যালোকের ফ্রিকোয়েন্সি দিয়ে এই রিং-এ একটি পরিসীমা গঠিত হয়। সূর্যালোক আমাদের বায়ুমন্ডলের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় হালকা বর্ণালী বেগুনী, সবুজ অংশ মূলত আউট ফিল্টার হয়। এই একই প্রভাব বা উপায় দ্বারা, দিনের সময় আমাদের আকাশ নীল করে তোলে। এদিকে বর্ণালী এর লাল অংশ অন্তত প্রভাবিত হয়।এই লাল আলো প্রথম বায়ুমণ্ডল যখন প্রবেশ করে, এটা ভূপৃষ্ঠের দিকে নিচু (প্রতিসৃত) হয়। এটা পৃথিবীর অন্য দিকে প্রস্থান করে আবার এটি নমিত হয়। এই ডবল নমন পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদের দিকে লাল আলো পাঠায় আর আমরা চাঁদকে লাল দেখি।
ভুধরের টান বলতে মনে হয় মধ্যাকর্ষণ শক্তিকে বুঝানো হয়েছে। নকশাগুলো আর “কম্পমান ষিষট্টি পাঁচ। পরিভ্রমণ ভয়ংকর। রক্ষক সাবধান!” এর কোনো মানে আমরা বের করতে পারিনি।
৪.
আর কিছু বের করতে না পেরে আমরা শেষে সিদ্ধান্ত নেই সেখানে ফিরে যাওয়ার যেখানে এসব শুরু হয়েছিল, আমার গ্রামের বাড়িতে। আসার আগে কাজে লাগে এমন সব জিনিস সাথে করে নিয়ে এসেছি। অলক, সান্দ্রা আর নিমা নিজেদের বাড়িতে গিয়েছে দেখা করে আসার জন্য।
বাড়িতে আসার চতুর্থ দিন। কাজের কোনো অগ্রগতি হয়নি। আসলে হয়নি বললে ভুল হবে। খানিকটা হয়েছে। সোনার ফলকটার থ্রিডি ইমেজ দেখে সান্দ্রা বুঝতে পারলো এটা একটা পাজল বক্স টাইপের কিছু। গ্রিক, রোমানদের সিক্রেট সোসাইটিগুলো এই ধরণের পাজল ব্যবহার করতো তাদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা কোনো গোপন বিষয়ের অস্তিত্ব লুকিয়ে রাখার জন্য। সান্দ্রা ছোটবেলা থেকেই পাজল মিলানোতে খুব দক্ষ ছিল। তাই ও পাথরটা নিয়ে অনেক্ষন ঘাটাঘাটি করে। আলট্রাভায়োলেট রশ্মি দিয়ে পাথরটা পরীক্ষা করার সময় আমরা কিছু সরু ফাটল দেখতে পাই ফলকটার পাথরের অংশে। খুব চিকন পিন দিয়ে ফাটল গুলো পরিষ্কার করার পর তা মোবাইলের ডায়াল বক্সের আকার নেয়। আলতো করে একটা ডায়ালের উপর চাপ দিতেই খানিকটা ধূলা বের হয়ে এসেছিলো আর আমরা সবাই লাফিয়ে পিছনে সরে গিয়েছিলাম। চাপ দেওয়ার কারণে কিনা জানিনা, ডায়াল এর জায়গাটুকু উপরে উঠে আসে আর একটি ইমেজ পাজেলের আকার নেয় সেটা। সান্দ্রা ঘন্টা খানেকের মধ্যে ডায়ালগুলো এদিক্ সেদিক নাড়িয়ে সমাধান করে ফেলে। সমাধানের পর সেটার উপর একটা খাঁজকাটা বৃত্ত দেখতে পাই আমরা। বৃত্তটা ধরে নিমা চাপ দিতেই তা আগের জায়গায় বসে যায় আর আরেকবার ধূলা উড়িয়ে সোনার ফলক আর পাথরের আলাদা হয়ে যায়। মাঝখানে পাথরের খাঁজ থেকে একটা প্রাচীন চাবি বের হয়ে আসে। আমরা সবাই অবাক হয়ে তাকিয়েছিলাম। কারণ চাবিটা ছিল কাচ বা হিরার কোনো ক্রিস্টালের তৈরি। মনে মনে নিজের ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিলেও পরে দোষ দিয়েছিলাম। কারণ চাবি পেলেও তার তালা বা দরজা এখনো পাইনি।
আমরা চিন্তা করলাম যেখানে ফলকটা পেয়েছিলাম সেখানে ও আশপাশের এলাকা আলট্রাসনিক সাউন্ড স্ক্যানার দিয়ে সার্চ করে দেখবো, যদি আরো ফলক বা অন্যকিছু পাওয়া যায় নাকি। সারাদিন পুরো এলাকা চষে বেড়িয়েও কোনো লাভ হলো না। কোনো প্রয়োজনীয় সংকেত পেলাম না স্ক্যানার থেকে। হতাশ হয়ে সবাই আমাদের সেই গোপন খেলাঘরে গিয়ে বসলাম। এটা ছিল একটি পাতালঘর যা আমি ছোটবেলায় লুকোচুরি খেলতে গিয়ে খুঁজে পাই। ভেন্টিলেশনের সুবিধা আছে। আমাদের শুধু আলো জ্বালিয়ে নিতে হতো।
গল্প করতে করতে মনের খেয়ালে আমি স্ক্যানারের সুইচে চাপ দিয়ে ফেলি। খানিকক্ষন পরেই বিপবিপ এর তীক্ষ শব্দে আমরা চমকে উঠি সবাই। স্ক্যানারের একটা বৈশিষ্ট্য হলো যতো বড় জিনিস লোকেট করতে পারবে ততো তীক্ষ শব্দ হবে। এবার মনে হয় বড় কিছুই ধরা পড়েছে স্ক্যানিং-এ।
ঘটনার আকস্মিকতায় আমরা হতবাক হয়ে পড়েছিলাম। যার খোঁজে সারা গ্রাম ঘুরে বেড়িয়েছিলাম আর তা কিনা আছে আমার বাড়ির নিচেই!
অলক তো রসিকতা করে বলল
-ওয়াহ! বাসা তোর বলে বলে আবার গুপ্তধন পেয়ে আমাদের ভাগিয়ে দিস না!
-হাহাহা। দেব না!
আমি চোখ টিপে বললাম।
৫.
সেদিনই লোক ভাড়া করে জায়গাটা খুঁড়তে লাগলাম আমরা। প্রায় ৬ গজ বাই ৬ গজের একটা চৌকো পাথরের ব্লক বের হলো মাটিতে। এর পাশে আর কিছুই নেই। আর পাথরের ব্লকটা মাটির অনেক নিচে চলে গিয়েছে বলে আমরা ধারণা করছি। শ্রমিকদের মজুরি দিয়ে বিদায় করে দিলাম।
আমরা চারজনে তারপর পাথরের ব্লকটা পরিষ্কার করলাম। পরিষ্কারের সময় একটা সুইচে চাপ পড়ায় ব্লকটার একপাশ দিয়ে ছোট আরেকটা ২০ বাই ২০ ইঞ্চির ব্লক বের হয়ে আসে। এটা অবশ্য কাঠের তৈরি। ব্রিফকেস টাইপের একটা বক্স। ভিতরে অনেকগুলো কাচের আয়না একটার উপর একটা আর একদম নিচে একটা সোনার পাতলা বার পেলাম আমরা। সোনার বারটার দুই পিঠেই অনেক কিছু লেখা। কিন্তু কি লেখা তা পড়তে পারলাম না। এমনকি অলকও বুঝতে পারলো না কি লেখা আছে। এরকম লেখা নাকি ও প্রথম দেখছে। মজার ব্যাপার হলো লেখাগুলো বাইরের দিকে বের হয়ে আসা। এরকম হওয়ার নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। যতোই সময় পার হচ্ছে, প্রাচীন যান্ত্রিক কলাকৌশল দেখে ততোই অবাক হতে হতে এখন আর এসব অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে না আমাদের। বড় পাথরের ব্লকটায় ডানপাশে আরেকটা ছোট কি-হোল পেলাম আমরা, একটা কাঠ দিয়ে ঢাকা ছিল। সেটা পেয়েই তাড়াতাড়ি ক্রিস্টালের চাবিটা ঢুকালাম আমরা কি-হোলে। ঠিকভাবে ঢুকলোও। কিন্তু কোনো দিকে মোচড় দেওয়া গেল না। বেশি জোরাজুরি করলাম না আমরা। চাবিটা ভেঙ্গে যেতে পারে। ওদিকে সন্ধ্যা হয়ে আসছে। তাই সবাই আজকের মত সবকিছু ইস্তফা দিয়ে ঠিকভাবে পাতাল ঘরে তালা মেরে উপরে উঠে এলাম।
রাতে খাবার খাওয়ার সময় সান্দ্রা “ইউরেকা” বলে লাফিয়ে উঠলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম
-কিরে? তোর কি হয়েছে?
-পেয়েছি!
-আরে বাপ, কি পেয়েছিস তা তো বল!
-কিভাবে চাবি দিয়ে খোলা যাবে!
-কি খোলা যাবে?
নিমা মুরগির রান চিবোতে চিবোতে বলল।
-আরে ঐযে লকটা আমরা খুলতে পারিনি পাতাল ঘরে।
অলক হা করে তাকিয়ে আছে। আমিও বিস্ময়ের ধাক্কা কাটিয়ে বললাম
-কিভাবে?
-এটা একটা পার্সিয়ান লকিং সিস্টেম। আরবরাও এটা ব্যবহার করতো। মনে আছে আমরা অনেকগুলো আয়না পেয়েছি?
-হুম। তো?
এবার অলকের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেল।
-তো ব্যাপারটা হলো আয়নাগুলো নির্দিষ্ট স্থানে বসিয়ে আলোক রশ্মিকে ক্রমশ প্রতিফলিত করে নিয়ে চাবিটার উপর ফেলতে হবে। তাহলেই লকটা খুলে যাবে।
-তাই নাকি?
অলকের কন্ঠে হালকা অবিশ্বাস।
-হুম, এতেই হবে। চল সবাই!
-কোথায়?
নিমা জিজ্ঞেস করলো।
-আয়নাগুলো বসাবো!
-কিভাবে?
-প্রথম যে সোনার পাতটা পেয়েছিলাম, তার উপরের নকশাটাই হলো আয়না বসানোর জায়গা। এখন বুঝতে পেরেছি! ওটা দেখে দেখে বসালেই হবে।
-এই অন্ধকারে? হবে না। কালকে। খাবারটা খাও ঠিকমত।
-ধুরো!
সান্দ্রা খানিকটা মনঃক্ষুন্ন হল। কিন্তু নিমা যা বললো তা মেনে নিলো। ওর ছেলেমানুষী ভাবটা এখনো গেল না। কিন্তু সান্দ্রার এই আবিষ্কারের কারণে কোনো একটা বিষয় আমার মনে বার বার দাগা দিচ্ছে। কিন্তু ব্যাপারটা কি ধরতে পারলাম না।
৬.
রাত্রে যখন ঘুমানোর আয়োজন করেছি তখনই ব্যাপারটা মাথায় আসলো। এতো সাধারণ ব্যাপার আগে মাথায় আসেনি দেখে অবাক হলাম। হয়তো সাধারণ দেখেই চোখে পড়েনি।
ব্যাপারটা হল নতুন পাওয়া স্বর্ণ প্লেটটার সাথে আমাদের বর্তমান কালের অফিসিয়াল সিলের খুব মিল রয়েছে। সিলে যেরকম অক্ষরগুলো বাইরে বের হওয়া থাকে, এখানেও তাই ঘটছে। এটা যদি সিলই হয়ে থাকে তাহলে, ওটায় যা লেখা আছে তা বাস্তবে হলো উলটো! আমি তাড়াতাড়ি বাথরুম থেকে কাপড়ে দেয়ার নীল রংটা এনে প্লেটটার একপাশের লেখাগুলোর উপর লাগালাম। তারপর একটা কাগজে ছাপ দিতেই লেখাগুলো স্পষ্টভাবে ফুঁটে উঠলো। আমি একা কাজটা করতেছিলাম। বাকিরা ঘুমাচ্ছিলো।
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলাম লেখাটার দিকে। স্পষ্ট করে আমাদের বর্তমান বাংলা অক্ষরে লেখা। একটা লিস্ট। লিস্টে অনেক মানুষের নাম লেখা। একদম শেষ নামটা পড়ে আমার প্রায় দম বন্ধ হয়ে এলো। কোনো মতে নিজেকে সামলে আমি তাড়াতাড়ি সোনার পাতটার অপর পৃষ্ঠার লেখাটা বের করলাম। এবার আমার আর কিছু বলার ক্ষমতা নেই। আমি তাড়াতাড়ি সব কালি পরিষ্কার করে সোনার পাতটা আগের মত রেখে দেই। ওরা কেউ না থাকায় খুব ভালো হয়েছে। সিল দেওয়া কাগজের লেখাগুলো আরেকবার ভালোভাবে পড়ে আমি কাগজটা আগুনে পুড়িয়ে ফেলি।
৭.
পরদিন সবাই মিলে প্রথমে পাওয়া সোনার পাতটার নকশা অনুসারে আয়না বসাতে শুরু করলাম। তার আগে অবশ্য আয়নার টুকরাগুলোকে পরিষ্কার করে নিতে হয়েছিল। নকশাটায় উপরে আর নিচে দুইদিকে অ্যারো কি দেওয়া ছিল। ঐটাকেই আমরা উত্তর-দক্ষিণ ধরে কাজ করতেছিলাম। আয়নার অবস্থানগুলো যেন আমাদের পাতালঘরের জন্যই বানানো হয়েছিল। একদম জায়গামত রাখা গেল আয়না গুলোকে। সব শেষের আয়নাটাকে বাইরে রাখতে কারন আলো আসবে ওখান থেকেই। মানে সূর্য বা চাঁদ থেকে আলো প্রথমে বাইরে রাখা আয়নাটায় পড়বে। সেখান থেকে প্রতিফলিত হয়ে ভিতরে রাখা একটি আয়নায়। সেখান থেকে আরো একটি। এভাবে চলতে চলতে সবশেষে আলো চাবিটার উপর পড়বে। আর তাতেই চাবিটার ভিতর আলো গিয়ে একটি নির্দিষ্ট মেকানিজমে লকটা খুলবে। এটাই ব্যাখ্যা করে আমাদের বলেছিল সান্দ্রা।
কিন্তু লকটা খুললো না। খুলবেও না। কারণটা আমি জানি। ওদের হয়তো বলতাম না। কিন্তু এবার নিমা বের করলো সমাধান। ও বলল
-আমাদের মাতাল চন্দ্রের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
-কেন?
অলক জিজ্ঞেস করলো।
এবার আমি বললাম
-কারন ড্রাঙ্কেন মুন বা ব্লাডি মুনের সময় একটা নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘের আলোকরশ্মি আসে চাঁদ থেকে যা শুধু ঐ তিথিতেই চাঁদ থেকে বিচ্ছুরিত হয়।
-ও আচ্ছা। পরবর্তী ড্রাঙ্কেন মুন কবে?
সান্দ্রা জিজ্ঞেস করে।
অলক ল্যাপটপে খানিকটা ব্রাউজ করে বলে
-২৬ মার্চ, ২০১৫। মানে কালকে!
-ওয়াও। আমাদের দেখি লাক খুব ভালো। কিন্তু আরেকটা সোনার পাতের কি হবে?
সান্দ্রা জিজ্ঞেস করে।
-জানি না। বের করতে পারিনি ওটার মানে।
অলক বলল।
আমিও গোপনে একটা সস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। এখন শুধু ড্রাঙ্কেন মুনের জন্য অপেক্ষার পালা।
৮.
এবার ফিরে আসা যাক ২৫ শে মার্চ, রাত ১১ টায়।
অলক বাইরে গিয়ে গিয়ে শেষ আয়নাটা বসিয়ে আসলো। ড্রাঙ্কেন মুন তার আপন লালিমায় গৌরবের সাথে আলো বিচ্ছুরিত করছে। কেমন যেন একটা মাতাল করা জোছনা। হয়তো এজন্যই একে ড্রাঙ্কেন মুন বলে।
প্রথমে বোঝা যায়নি। কিন্তু পরে আমরা দেখলাম একটা খুব পাতলা আলোর ধারা আয়নাগুলোয় প্রতিফলিত হয়ে কি-হোলের উপর দিয়ে যাচ্ছে। আমি চাবিটা নিয়ে কি-হোলের কাছে গিয়ে ওদের দিকে তাকালাম। ওরা শ্রাগ করে আমাকে সায় দিল। আর আমি চাবিটা কি-হোলে ঢুকিয়ে দিলাম। অপেক্ষা করলাম, কিন্তু কিছুই হলো না। একটা তীব্র হতাশা আমাদের গ্রাস করলো। আমি যখন ঘুরে ফিরে যেতে শুরু করেছি, তখন নিমা চিৎকার দিয়ে উঠলো। আমি আবার পাথরের ব্লকটার দিকে তাকাতেই দেখলাম মাঝখান থেকে একটা কালো গহ্বর দেখতে পেলাম।
-স্লাইডিং ডোর!
সান্দ্রা বিস্ময় সামলাতে না পেরে বলল।
আমি কিছু না বলে ব্যাকপ্যাক থেকে একটা টর্চ বের জ্বেলে নিয়ে গর্তে উকি দিলাম। একটা সিড়ি দেখা যাচ্ছে।
খানিক্ষণ পর,
রাত ১১.৩০ টা। আমরা চারজন আমাদের ল্যাবের টেবিলটা ঘিরে দাঁড়িয়ে আছি। আমি, নিমা, অলক আর সান্দ্রা মিলে আমাদের সব গ্যাজেটস আর প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো শেষবারের মতো চেক করে দেখছি। একটু ভুল হলে অনেক বড় ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা আছে। এতদিনের গবেষণা কিছুতেই ভণ্ডুল হতে দেয়া যাবে না। আমি সবকিছু দেখে ওদের দিকে তাকালাম। সবার চোখেই উত্তেজনার স্পষ্ট ছাপ। শুধু সান্দ্রাকে একটু চিন্তিত দেখাচ্ছে। আমি হাত দিয়ে টেবিলে টোকা মেরে সবার দৃষ্টি আকর্ষন করে বললাম…
-তোরা এখনও শিওর যে এটা করতে চাচ্ছিস?
অলক মাথা নেড়ে বলল
-হুম।
-এতে কিন্তু আমাদের ফিরে না আসার চান্স খুব বেশি।
-আমরা জানি। … সান্দ্রার দৃঢ় উত্তর।
-আচ্ছা,তাহলে আমরা এখন শুরু করতে পারি।
আমরা ইনফ্রারেড গগলস পড়ে নিলাম। অতঃপর আমি হাতে স্বর্ণ-ফলকটা নিয়ে সামনে এগোলাম। চাবিটা আগেই খুলে নিয়েছিলাম, যদি কোনো কাজে লাগে এই ভেবে। আমরা চারজনে সিড়ি বেয়ে নামতে শুরু করলাম নিচের দিকে। জানি না নিচে কোন বিস্ময় অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। আদৌ কোনো বিস্ময় আছে কিনা তা কে বলতে পারে!
৯.
সিড়ি দিয়ে নামার পথটা অনেক সরু। আমাদের সাইজের মানুষের নামতে সমস্যা নেই, কিন্তু মোটা মানুষ হলে আঁটকে যেত। আর অনেকটা ভ্যাপসা গন্ধ। আমি সবার আগেই নামতেছি। ইনফ্রারেড চশমায় চারপাশটা অনেকটা ভুতুরে দেখাচ্ছে। সবার প্রথম আমিই শব্দটা শুনতে পেলাম। একটা ফোস ফোস জাতীয় আওয়াজ। এতক্ষণ সোজা চলতেছিলাম। হঠাৎ একটা মোড় আসলো সামনে। আমি কিছুই বুঝতে পারিনি। আগের মতই চলতেছিলাম কিন্তু মোড়টা ঘুরতেই হঠাৎ একটা খাঁদ হাজির আর আমিও ততক্ষণে খাদের উপর শূণ্যে পা দিয়ে ফেলেছি!
নিচে পড়ে যেতে শুরু করলাম। মাথার ভিতরটা ফাঁকা হয়ে যেতে লাগলো। কিন্তু পিছন থেকে একটা টান অনুভব করলাম। কয়েক মুহূর্ত পরে আরো জোরে টান আর আমি আবার মাটির উপর নিজেকে আবিষ্কার করলাম।
-আরেকটু হলেই তো গেছিলি!
হাঁপাতে হাঁপাতে অলক বলল।
আমি কোনো কথা বলতে পারলাম না। নীরবে কৃতজ্ঞতা জানালাম সবাইকে। খাঁদের নিচের দিকে তাকাতেই ঘাড়ের লোম দাঁড়িয়ে গেল। খাঁদের নিচে বিশাল বিশাল এ্যানাকন্ডা সাপে ভরা। একেকটার সাইজ হবে প্রায় ১৫-২০ ফুট। এটা একটা বুবি ট্রাপ। এরা এখানে কিভাবে বেঁচে আছে কোনো ধারণাই নেই আমাদের।
কিভাবে খাদটা পেরোনো যায় সে নিয়ে সবাই ভাবতে শুরু করলাম। নিমা একটা কি-হোল পেল বাম পাশের দেয়ালে। এবার চাবিটা ঢুকিয়ে হালকা ঘুড়াতেই দেয়ালের ভিতর দিয়ে একটা দরজা খুলে যায়। আর আমাদের পায়ের সমতল মাটি একদিকে কাঁত হয়ে পড়ে। আমরা সবাই পিছলিয়ে যাই। আর চিৎকার দিয়ে পিছলিয়ে দরজা পার করে আমরা সবাই একসাথে আরো নিচে নামতে থাকি।
মনে হল অনন্তকাল ধরে নিচে নামছি পিছলিয়ে। যে জিনিসের উপর উপর দিয়ে পিছলিয়ে পড়ছি সেটাকে আর মাটি বা পাথর বলে মনে হচ্ছে না। পিচ্ছিল কোন ধাতব জিনিসের তৈরি বাচ্চাদের স্লাইডিং খেলার যন্ত্রটার মতো। ইনফ্রারেড গ্লাস পড়ে থাকার কারণে আর তীব্র বেগে নিচে নামার জন্য বুঝতে পারছি না জিনিসটা কি। প্রথমে সবাই চিৎকার করলেও এখন কানের পাশের বাতাসের শা-শা শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আজব ব্যাপার এতো নিচেও বাতাস আছে আর আমি নিঃশ্বাস নিতেও পারছি! বাতাসের কোনো অভাব নেই। একসময় পিছলানো জায়গা থেকে থেকে সজোরে ছিটকে বের হয়ে আসলাম আর কোনো শক্ত কিছুতে ধাক্কা খেয়ে আমার চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেল।
১০.
মাথাটা এখন একটু হালকা হালকা লাগছে। নিজেকে অদ্ভূত আর অনেক হালকা মনে হলো। নিজের সাথে অন্য কারো বা কোনো শক্তির অস্তিত্ব অনুভব করছি। অসীম এক সজীবতা ভর করেছে আমার ভিতরে। চারটে হৃদস্পন্দনের কম্পন অনুভব করতে লাগলাম। চোখ খুলে তাকাতেই চারপাশের অবস্থা দেখলাম। নিমা মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে, অলক আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। আর সান্দ্রা কই? তখনই বুঝতে পারলাম আমার মাথা ওর কোলের উপরে।
আমি উঠে বসলাম। মনে হচ্ছে আমার ওজনটা হঠাৎ করেই যেন অনেক কমে গিয়েছে।
-সাবধানে!
নিমা ভাঙ্গা গলায় বলল।
-মানে?
-এখানে মধ্যাকর্ষণ শক্তি অনেক কম!
-ও আচ্ছা। মুন ওয়াক করতে হবে মনে হয়।
-হ্যাঁ।
ধাক্কা লাগার কারণে আমার ইনফ্রারেড চশমা ভেঙ্গে গিয়েছে। তাই অন্ধকারে হাতরে হাতরে ব্যাকপ্যাকটা থেকে টর্চলাইটটা বের করে জ্বালিয়ে ধরলাম। সবাই কমবেশি আহত হয়েছে। সবার চশমা আর হাতঘড়ির অবস্থা দফারফা। কিন্তু আমি ওদিকে না দেখে চারপাশের আলোর প্রতিফলন গুলোর দিকে তাকালাম। দেয়ালে কয়েকটা পাথর থেকে আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। আমাদের কাছেই একটা ড্রেনের দেখা পেলাম। একরকম হেলে-দুলেই কষ্ট করে ড্রেনটার কাছে গেলাম। ওজন কম হওয়ায় হাঁটতে খুব অসুবিধা হচ্ছে। ড্রেনটা একরকম ঘন, তরল পদার্থে ভর্তি। গন্ধ নিয়ে বুঝলাম জ্বালানি তেল। তারপর পকেট থেকে ম্যাচ বের করে ড্রেনের তেলে আগুন দিলাম। দাউ দাউ করে জ্বলে আগুনটা সারা ড্রেনে ছড়িয়ে পড়লো অনেকদূর পর্যন্ত আর চারপাশ আলোকিত করে তুলল। বিস্ময়ে আমাদের সবার মুখ দিয়ে অস্ফূট শব্দ বের হয়ে আসলো।
১১.
আমরা বিশাল একটি হল ঘরে দাঁড়িয়ে আছি। আগুনের ড্রেনটা আয়তাকার ভাবে, হলের দেয়ালের গায়ে গায়ে সারা ঘরে বিস্তৃত আছে। ঘরটি প্রায় একটা ফুটবল মাঠের সমান। চারপাশের দেয়ালে অনেক নকশা করা আর চিত্র আছে। ঘরের মাঝখানে একটা বিশাল হালকা আলোকিত কাঁচের গোলক দেখতে পেলাম। প্রথম কয়েক মিনিট আমরা নীরবে পার হলো। নীরবতা ভঙ্গ করল সান্দ্রা।
-ওটা কি?
-জানি না।
ক্লান্ত কন্ঠে বলল অলক।
-চল কাছে গিয়ে দেখি।
-আচ্ছা।
বলে ওর পিছু পিছু আমরা গোলকটার দিকে এগোলাম। ঘরের অন্যান্য জিনিসের চেয়ে ওটাই সবচেয়ে আকর্ষণীয় মনে হলো সবার কাছে।
কাঁচের গোলকটা মাটি থেকে কয়েক হাত উপরে শূণ্যে ভাসছে। ওটার ভিতরে আবার একটা ফুটবলের সাইজের আলোকিত গোলক ভাসছে। আমি ধীরে ধীরে সব কিছুর উত্তর পেয়ে গেলাম। আমার ভিতরে কেউ একজন বারবার বলছে ওদের মেরে ফেলতে। কিন্তু আমি দাঁড়িয়ে ওদের দেখতে লাগলাম। অলক হাত দিয়ে ধরে দেখতে চাইলো গোলকটাকে। কিন্তু তার আগেই আমি চিৎকার দিয়ে উঠলাম
-খবরদার! ভুলেও ধরিস না।
-কেন?
-ওটা একটা ফোর্সফিল্ড। একইসাথে একটা এন্টিম্যাটার ধারক!
-মানে কি? তোর মাথা ঠিক আছে তো?
নিমা বলল।
-না, আমি ঠিকই বলছি। ওটা কার্বন পার্টিকেলের এন্টিপার্টিকেলের একটা সমন্বিত পদার্থ। প্রতিপদার্থ বা এন্টিম্যাটার সৃষ্টি হয় সেই বিগ ব্যাং এর সময় থেকে। এই এন্টিম্যাটার এর গুনের কারণেই আজ সব মহাজাগতিক সৃষ্টি তার কক্ষপথে থাকে, সব বস্তু ভূমিতে আঁটকে থাকে। যাকে নিউটন মধ্যাকর্ষণ বলে গিয়েছেন।
-তুই এসব কি করে জানলি?
অলক অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে। আমি সবার মুখের দিকে একবার তাকাই। তারপর বলি
-কারণ আমি আর আমার পূর্বপুরুষগণ এইসব সিক্রেট ও গ্রাভিটির রক্ষক!
১২.
ওদের দেখে মনে হলো কেউ যেন ওদের এইমাত্র গাড়িচাপা দিয়েছে। সান্দ্রা হাঁটু ভেঙ্গে মাটিতে বসে পড়লো।
-এসবের মানে কি? সব খুলে বল প্লিজ।
অনুনয় করলো নিমা।
-আচ্ছা বলতেছি।
বলেই একটা লম্বা দম নিয়ে আমি বলতে শুরু করলাম।
-সম্রাট অশোকের সময়ে নয়মানবের একটা সিক্রেট সোসাইটি ছিল। এসম্পর্কে তোরা জানিস। তাদের সময়ে একটা মহাজাগতিক সমস্যার সৃষ্টি হয় যার কারণে পৃথিবীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে। এর গ্রাভিটেশন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। তাই পৃথিবীকে রক্ষা করার জন্য সেই নয়মানব এ্যালকেমি ব্যবহার করে এই ফুটবল সাইজের এন্টিম্যাটার তৈরি করে এখানে যা ব্যবহার করে তারা মধ্যাকর্ষণকে ঠিক রাখে ও তাই আজ আমরা বেঁচে আছি!
-তাহলে এর সাথে তোর সম্পর্ক কি?
সান্দ্রা জিজ্ঞেস করে।
-ঐযে বললাম, আমি ও আমার পূর্বপুরুষরা এই সিক্রেটের রক্ষক। সেই নয়মানব এই সিক্রেট রক্ষা করার জন্য একটা রক্ষক পরিবারকে দায়িত্ব দেয়। তাদের ডিএনএ তে কিছু পরিবর্তন করে এই দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। বংশানুক্রমে আমার বাবা রক্ষক ছিলেন, এখন তার মৃত্যুর পর আমি হয়েছি! আমি এসব ঐ দ্বিতীয় স্বর্ণপাত থেকে জানতে পারি। যেটা আমার বাবা বানিয়ে ঐখানে রেখেছিলেন। ওটায় সে সময় হতে আজ পর্যন্ত সব রক্ষকদের নামের তালিকা আর তাদের কর্তব্য সম্পর্কে দিক নির্দেশনা আছে। শেষ নামটা আমার বাবার। হয়তো তার ইচ্ছা ছিল আমাকে দেওয়ার। কিন্তু তার আগেই মারা যান তিনি।
-তোর কথামতো এই জিনিসটা এন্টিম্যাটার হলে, আর তার মধ্যাকর্ষণ ক্ষমতা থাকলে আমাদের তো এর ভিতরে টেনে নেওয়ার কথা। কারণ আমরা এটার সবচেয়ে কাছে অবস্থান করছি।
অলক যুক্তি দেখানোর চেষ্টা করে। আমি ওর যুক্তির ত্রুটিগুলো সংশোধন করে দিলাম
-এর কারণ হলো মহাবিশ্বের চারটি মৌলিক বলের মধ্যে সবল নিউক্লিয় বলের ক্ষমতা মধ্যাকর্ষণের তুলনায় প্রবল। এই হলঘরটা কেন্দ্রমন্ডলের খানিকটা উপরে আছে আর এই অবস্থানের কারণেই পৃথিবী ৬৬.৫ ডিগ্রিতে নিজ অক্ষে আবর্তন করে! এন্টিম্যাটার এর ম্যাটারের প্রতি আকর্ষণ খুব প্রবল। কিন্তু এই আকর্ষণ দূরত্ব বাড়ার সাথে সাথে সমানুপাতে বাড়তে থাকে। তাই পৃথিবী পৃষ্ঠে আমরা মধ্যাকর্ষণ বেশি অনুভব করি এখানের তুলনায়।
১৩.
-কিন্তু ম্যাটার আর এন্টিম্যাটার তো একসাথে রাখলে তা পরস্পরের সংস্পর্শে এসে বিস্ফোরিত হয়! এটা টিকে আছে কি করে?
এবার সান্দ্রার জেরা শুরু… ।
-এন্টিম্যাটারকে শূণ্যে রাখলে তা বিস্ফোরিত হয় না। তাই এই বড় গোলক বা স্পেশাল এন্টিম্যাটার কনটেইনার বা ধারক বানানো হয়েছে তা রাখার জন্য।
আমি বুঝিয়ে বললাম।
-এখন বুঝতে পারছি প্রথম পাওয়া স্বর্ণপাতের কথা!
সান্দ্রা বলল। অলক আর নিমা মাথা নেড়ে ওকে সায় দিলো। আগুনের আভায় সবার মুখ উত্তেজনায় চকচক করছে।
-কিন্তু আরেকটা বিষয় বুঝতেছি না। পরিভ্রমণ ভয়ংকর মানে কি?
নিমা এবার আসল প্রশ্নটা করলো। আমি খানিকটা চুপ থেকে বললাম,
-ব্যাপারটা হলো ড্রাঙ্কেন মুনের সময় সেই আয়নার আলো এখানে এসে এই এন্টিম্যাটারের উপর পরে আর প্রত্যেক রক্ষক কিছু ক্ষমতার অধিকারী হয়। তারা তখন নিজের ইচ্ছেমতো টাইম ও স্পেসে ট্রাভেল করতে পারে। চাইলে অন্যান্য প্রানী বা বস্তুকে ট্রাভেল করাতে পারে!
-তারমানে তুইও?
-হুম।
আমি শ্রাগ করে বললাম।
-এখন কি হবে?
অলক চিন্তিত হয়ে বললো।
-ফিরে যাব আমরা।
নিমার উত্তর।
কিন্তু আমার ভিতরে কেউ প্রবল চাপ সৃষ্টি করছে ওদের মেরে ফেলার জন্য। আমি ঘুরে তীব্র স্বরে বললাম
-না, তোরা এখান থেকে জ্যান্ত ফিরে যেতে পারবি না। তাহলে গ্রাভিটির গোপণীয়তা ফাঁস হয়ে যাবে। আর পৃথিবীতে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়ে যাবে। আই হ্যাভ টু কিল ইউ অল।
-কি বলছিস এসব, লিও? আমাদের মেরে ফেলবি!
অলক যেন নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছে না।
-হুম। আমি রক্ষক, দায়িত্ব পালন করতেই হবে। তাতে তোদের মেরে ফেলতে হলেও!
-তুই উন্মাদ, তুই বদ্ধ উন্মাদ! আমরা তোর জানের বন্ধু! মেরে যখন ফেলতে চাস তো এখান আনলি কেন?
নিমা ভয়ে ভয়ে বলে।
-আমার কিছু করার নেই। আগে শুধু লিও ছিলাম। এখন রক্ষক! আমাকে মাফ করে দিস।
বলে আত্মরক্ষা করার জন্য আমার আনা একমাত্র রিভলবারটা উঁচু করে ওর দিকে তাক করলাম।
-প্লিজ লিও!
সান্দ্রা অনুনয় করলো। ওর চোখে আমি কোনো ভয় বা অন্য অনুভূতি পেলাম না। সেখানে ছিলো লিও নামের কারো জন্য তীব্র ভালোবাসা।
কিন্তু আমি রক্ষক। দায়িত্ব পালন করতেই হবে।
-বিদায়!
আমি বললাম।
১৪.
আজ আমি ৭০ বছরে পা দিয়েছি। খুব শীঘ্রই হয়তো পৃথিবী থেকে বিদায় নেবো। তার আগে দায়িত্ব দিয়ে যাবো আমার ছেলের কাছে। সেদিনের পর পৃথিবীতে ফিরে আমি রক্ষক হলের গোপণীয়তা আরো বাড়িয়ে দিয়েছি। উন্নত করেছি গোপনীয়তার প্রযুক্তিকে। সব পরিস্থিতি খুব ভালভাবেই সামাল দিয়েছিলাম ড্রাঙ্কেন মুনের ক্ষমতার সাহায্যে।
তবু মাঝে মাঝে আমি রক্ষক হলে ফিরে যাই। গভীর বিষন্নতা আর ভালোবাসা নিয়ে তাকিয়ে থাকি তিনজন মানুষের দিকে যারা আজ আমার কারণে স্থির সময়ের ফাঁদে আটকা পড়ে আছে!
সমাপ্ত