কলেজে নতুন
-‘এই ছেলে, দাঁড়াও|’ রাগি কন্ঠের ডাক শুনে পিছনে ফিরল আবির| ও এই কলেজে নতুন এসেছে এবং এখনো সবার সাথে পরিচিত হতে পারেনি| তাই কন্ঠস্বরের মালিককেও চিনতে পারলো না| মেয়েটি আবিরের সামনে এসে বলল, -‘নিজেকে কি মনে কর, আঁতেল?’ অবাক হয়ে চশমা ঢাকা চোখের দিকে তাকাল। নিলাঞ্জনা বলে চলল- ‘আমরা জীবনেও স্যারদের সামনে এইরকম করিনি...আর তুমি! দেখ ছেলে, স্যারদের সম্মান দিয়ে কথা বলবে।’ বলেই গটগট করে হেঁটে গেল।
-‘মেয়েটা কেরে?’ আবির প্রশ্ন করল ওর নতুন বন্ধু আরমানকে। -‘আরে ওতো আমাদের ক্লাসের ফার্স্ট মেয়ে। দোস্ত মেয়েটা কিন্তু হেভি ডেঞ্জারাস।’ –‘ক্যানো?’ –‘পরেই টের পাবি।’
ঘটনা হয়েছিল একটু আগে ওদের ক্লাসে। আবির বাংলা ক্লাসে ওর পড়ার বই বাদ দিয়ে গল্পের বই পরতেছিল। এই সময় স্যার ডাক দিলে ও উঠে দাড়ায়। স্যার বললেন –‘কি ব্যাপার? আমার লেকচার পড়া শুনতেছ না ক্যানও?’ আবির বলে – ‘স্যার এগুলোতো আপনি গতকালকেই পড়িয়েছিলেন।’ –‘তাই বলে ক্লাসে বসে ফালতু বই পড়বে?’ –‘জি...স্যার এটাতো আপনি যে গল্পটা পরাচ্ছেন তারই মূল উপন্যাস। আর এটাকে আপনি ফালতু বই বলতে পারেন না।’ স্যার আর কিছু বললেন না। চুপচাপ ক্লাস শেষ করে বেরিয়ে গেলেন। আর তার পরেই নিলাঞ্জনার সাথে দেখা।
যাই হোক, বাসায় ফিরে আবিরের একটু খারাপই লাগলো। বুজতে পারলো বেয়াদবি একটু বেশীই করে ফেলেছে। আর মেয়েটার রাগি চোখ দুটোর কথা বেশি মনে পরছে যেন ওই চোখে নিজেকে হারিয়ে যেতে দেখেছিল আবির। তাই পরদিন নিলাঞ্জনার কাছে গেল কথা বলতে। সামনে গিয়ে বলল –‘ইয়ে, আমি দুঃখিত কালকের ঘটনার জন্য।’ নিলাঞ্জনা বিস্মিত হয়ে বলল –‘আমার কাছে বলে কি লাভ হবে? তুমি বরং স্যারের কাছে বল।’ –‘আমিতো চিনিনা, তুমি কি আমার সাথে যাবে?’ –‘আচ্ছা চলো।’ এরপর স্যারের কাছ দিয়ে মাফ চাওয়া হল ও দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়ে গেল। দেখতে দেখতে তারা দুজন বেষ্টফ্রেন্ড হয়ে গেল।
১ বছর পর...
ইদানিং নিলাঞ্জনার মনে হচ্ছে আবিরের প্রতি ও ক্যানও যেন আকৃষ্ট হয়ে পরছে। আবিরের প্রতি মন থেকে একটা টান অনুভব করছে। বুজতে পারলো বন্ধুত্তের মধ্য দিয়ে আবিরকে ভালবেসে ফেলেছে। এটা আবিরকে বলতে হবে। কিন্তু আবিরও ক্যামন যেন করছে আজকাল। -‘আচ্ছা ওকি আমাকে গ্রহন করবে নাকি ফিরিয়ে দিয়ে আগের মত বন্ধু হয়ে চিরদিন পাশে থাকবে?’ , এসব ভাবতে ভাবতে কলেজে রওয়ানা দিল নিলাঞ্জনা।
-‘কিরে, ক্যামন চলছে?’ আবির বলল। -‘ভালোইতো। দ্যাখ আবির, তোর সাথে আমার কিছু জরুরি কথা আছে।’ –‘তাই নাকি! তা মহারানির জন্য আমি কি করতে পারি?’ নিলাঞ্জনা–‘বাইরে চল, কথা আছে।’ ‘আবির, হুহ... আমি তোকে মনে হয় ভালবাসি।’ সরাসরি কোনো জড়তা ছারা বলল নিলাঞ্জনা। লজ্জায় ফর্সা গাল লাল হয়ে গেল। -‘কি! ক্যামনে...মানে সত্যি নাকি?’ আবির টাস্কি খেয়ে বলল। –‘হুম। -ইয়ে, আমিও মনে হয় তোকে... ’-‘তাই?’ –‘হুম!’ –‘ক্যানো ভালবাসিস আমাকে?’ –‘কোনো! কারণ ছারাই।’ একটু হেসে আবির বলল – ‘আমিতো প্রথম দিনই তোর চোখ দেখে প্রেমে পরেছিলাম। তখন বুঝিনি, আজ বুজলাম!’ –‘তবেরে! এতদিন লাগলো বলতে! আমি মেয়ে হয়ে তোর আগে... ছি ছি ছি!’ –‘হাহ! যাই হোক!’ আবির কিছুটা মনমরা হয়ে গেল। -‘কিন্তু আমি তোর সাথে রিলেশন করতে পারব না। সরি দোস্ত ... আমি এটা করতে পারব না।’ –‘ক্যানো?’ নিলাঞ্জনা দুঃখভরা মনে জিজ্ঞেস করলো। -‘আমার মা আমাকে নিষেধ করেছে আমাকে এসব ব্যাপারে না জরাতে। আমি আমার মায়ের কথা অমান্য করতে পারি না।’ এইটা বলেই নিঃশব্দে স্থান ত্যাগ করলো আবির। নিজের প্রতি দুঃখ আর আবিরের মায়ের প্রতি স্রদ্ধা দেখে দুফোটা নিখাদ ভালবাসা ঝরে পরলো নিলাঞ্জনার চোখ থেকে।
ওই ঘটনার তিনদিন পর আবির ওদের বাসার ছাদে বসে সিগারেট খাচ্ছে। ওই দিনের পর থেকে ওর জীবন ওলটপালট হয়ে গেছে। সিগারেটও ধরলো... খাওয়া শেষ করে বাসার দরজা খুলে যেই ভিতরে ঢুকতে পা বাড়ালো অমনি চমকে উঠে থমকে দাড়ায়। পালাবে কিনা তা চিন্তা করলো... নাহ যা থাকে ভাগ্যে ভেবে ভিতরে প্রবেশ করে। ওদের বসার ঘরে আর কেউ নয় স্বয়ং নিলাঞ্জনা বসে আছে। পাশে আবিরের মা আর ওর বন্ধু আরমান। আরমান আবিরের ভাল বন্ধু হওয়ায় আগে থেকে সব জানত। আবিরের এই দুর্দশা দেখে আরমান সবকিছু নিলাঞ্জনাকে খুলে বলে। আর তাই পরদিনই আরমানকে নিয়ে সে আবিরের বাসায় যায় আর আবিরের মায়ের সাথে কথা বলে। এখন আবির বুজতে পারছে আরমান ক্যানো নিলাঞ্জনাকে ডেঞ্জারাস বলেছিল।
ভিতরে ঢুকে ওইদিকে না তাকানোর ভান করে সোজা নিজের রুমে যাওয়া শুরু করলো আবির। -‘ওই ব্যাটা, কই যাস?’ আরমান ডাক দেয় আবিরকে। -‘এইখানে আইসা বস চুপচাপ...’একটা খালি সোফা দেখিয়ে বসতে ইংগিত করলো আরমান। বিব্রত ও লজ্জারত অবস্থায় বসলো আবির। ভয়ে মায়ের দিকে তাকাতেও পারছে না। কিছুক্ষন সবাই চুপচাপ থাকল। তারপর আবিরের মা প্রথম কথা শুরু করলেন –‘আবির, নিলাঞ্জনা বলছে ও নাকি তোকে ভালবাসে! তুইও নাকি... কিন্তু আমার কারনে নাকি তুই ওকে ফিরিয়ে দিয়েছিস।’ –‘হ্যাঁ, মা।’ আবিরের ছোট্ট করে বলল। -‘তা আমিতো তোকে এসবে জরাতে নিষেধ করেছিলাম কিন্তু কিছু গোপন করতে বলিনি তো।’ আবির কিছু বলল না। মাথানত করে বসে রইল। -‘যাই হোক, যেহেতু আমি নিলাকে আগে থেকেই চিনি তাই ওর ব্যাপারে আমার কোনো অভিযোগ নেই। সত্যি বলতে কি ওর মতন ভাল আর মিষ্টি মেয়ে আমি এর আগে দেখিনি। আর তোর জন্যও আমার খুব গর্ব হচ্ছে। তোকে আশীর্বাদ করি বাবা যেন চিরদিন এইভাবে মায়ের কথা রাখিস। তাই আমি নিলার বাবা মায়ের সাথে তোদের ভবিষ্যতে বিয়ের ব্যাপারে কথা বলব।’ এই বলে আবিরের মা হেসে দিলেন। আবিরের বাবা মারা যাওয়ার পর এই প্রথম মাকে হাসতে দেখল আবির। আর যা শুনল তাতে নিজে বাস্তবে আছে কিনা চিমটি কেটে দেখল। ওইদিকে নিলাঞ্জনার মুখে অশ্রুসিক্ত হাসি। ভালবাসার মধুরতম নিষ্ঠুরতায় অন্য অনুভূতিগুলো স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে।
পরের দিন আবির আর নিলাঞ্জনা পথে হাঁটছে হাত ধরে। আবির কথার প্যাঁচে ফেলে নিলাঞ্জনাকে রাগাচ্ছে আর মিটিমিটি হাসছে। তার রাগি চোখ দেখতে খুব ভাল লাগে আবিরের। ভাবে...ওর জানপাখিটা তো আর জানে না রাগলে ওকে কি সুন্দর লাগে………..!!
সমাপ্ত