ছায়ানীল
১.
আজ অনেকদিন পর কলেজে যাওয়ার চিন্তা করলাম। আমি অনেকদিন পর পর পড়তে যাই। আমি সাধারণ মানুষ থেকে দূরে থাকতে চাই… এর একটা কারণ আছে। তা হয়তো কোনো একদিন বলবো।
গোপন ডেরা থেকে বের হয়ে রোদে দাড়ালাম অনেকদিন পর। খুব ভালো লাগছে। কাধে ব্যাগটা ঝুলিয়ে হাটঁতে লাগলাম। নতুন নতুন মানুষ দেখলাম। দেখলাম তাদের অন্তরের কলুষতা, স্বার্থপরতা। মানুষ যে প্রতিনিয়ত কতো অভিনয় করতে পারে তা বলে বুঝানো যাবে না।আমি অনেক কষ্ট করে এর সাথে মানিয়ে নিয়েছি।
ক্লাসে পৌছাতে একটু দেরি হয়ে গেল। যথারীতি প্রফেসর এর বকা খেয়ে শেষ বেঞ্চটায় বসলাম। যেইনা ব্যাগ থেকে বই বের করে বসলাম, একটা মেয়ে হুরমুর করে আমার পাশে এসে বসে পরলো। আমার মেয়েটার দিকে মুখ ফিরে তাকানো লাগলো না। দেখলাম খুব সুন্দরি…কাজল দেয়া টানা টানা চোখ। খুব উৎফুল্ল আর প্রানবন্ত মেয়ে। আগে কখনো দেখিনি ক্লাসে। হয়তো আমার অনুপস্থিতির সময়ে এসেছে। আমি যেহেতু মানুষজন থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করি, তাই আর আগ বাড়িয়ে কথা বললাম না। যদিও টেলিপ্যাথির সাহায্যে আগেই জেনেছি ওর নাম স্মরনী। আমার জন্মগত ভাবে এই ক্ষমতাটা খুব ভালো ভাবেই আছে। কয়েকটা ক্লাস পরে মনোযোগ দিয়ে লেকচার শুনতেছিলাম এমন সময় কলম দিয়ে খোচাঁ দিলো। পাশে তাকাতেই দেখলাম মিটিমিটি হাসতেছে।
-“কি হয়েছে?” জানতে চাইলাম।
-“কে তুমি? আগে তো ক্যাম্পাসে দেখিনি।” বললো মেয়েটা।
-“I am nobody.” বলেই উঠে ক্যান্টিনে চলে গেলাম। ঘন্টা পরে গেছে।
আজব তো… মনে মনে বললো মেয়েটা। কিন্তু আমি তো শুনতে পেয়েছি।
ক্যান্টিনে বসে টিফিন খাচ্ছি। এমন সময় মেয়েটার উপস্থিতি টের পেলাম ওখানে। সাথে আছে আমার ক্লাসের আরেক মেয়ে কেয়া। স্মরণী বলতেছে আমাকে দেখিয়ে –“ছেলেটার খুব ভাব! যেচে কথা বলতে গেলাম আর ভাব নিয়ে উঠে গেল!” –“আরে নাহ! ও তো ওইরকমই… কারও সাথে মেশে না। একা একা থাকে।” কেয়া বললো। -“ওমা, তাই নাকি! কেন?” –“কেউ জানে না।” –“তাহলে তো একটু ঘেটে দেখতে হয়।” বলেই খাবার নিয়ে আমার টেবিলের কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো বসবে কি না। বসতে দিলাম পাশে সরে।
কিছক্ষন পর আমাকে ওর খাবার থেকে আমাকে সাধলো। আমি খানিকটা বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম –“কেনো আমাকে জ্বালাচ্ছো?” –“বন্ধু হতে চাই!” নিষ্পাপ মুখ করে আছে। -“সম্ভব না। আমার সমস্যা আছে।” বললাম আমি খেতে খেতে। -“কি সমস্যা?” –“কিছু না। দুঃখিত!” বলে উঠে দাড়াতে দাড়াতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। মনটা খারাপ হয়ে গেল। এই প্রথম কেউ আমার বন্ধু হতে চেয়েছিল। অনুভব করলাম অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
কয়েকদিন পর ক্লাসে এক প্রফেসর আমাকে দাড় করালো একটা থিওরি বুঝিয়ে দিতে। ওইটা পড়া ছিল। তার পড়া নেয়ার ধরনই এমন। এখন আমাকে বুঝাতে হবে ওই থিওরি টা। আমি নিজেকে সবসময় ইচ্ছা করে খারাপ ছাত্র প্রমান করে এসেছি নিজেকে। কারন আমি চাই না আমার অসাধারণ ক্ষমতার কথা প্রকাশ পাক। যে তিক্ত অতীত আমি পিছনে ফেলে এসেছি তার আর পুনরাবৃত্তি হোক তা চাই না। তাই নিজেকে সবসময় লুকিয়ে রাখি যদিও আমি সব পারি। প্রফেসর তাই আমাকে দাড় করিয়ে রেখে বলল –“স্মরণী, দাড়াও আর এটা বুঝিয়ে বলো।” ও বলল। কিন্তু ২টা ভুল ছিল যা প্রফেসরও ধরতে পারেননি। আমি মুখ নামিয়ে দাড়িয়ে ছিলাম। উনি আবার শুরু করলেন নতুন এক পেচাল। উনি স্মরুণীকে দায়িত্ব দিলেন আমাকে ওই থিওরি বুঝিয়ে দিতে। যেখানে বাঘের ভয় ওইখানে পুরা রাত্র বানিয়ে দিলেন। যাই হোক, ক্লাস শেষে ও আমাকে নিয়ে বসলো শিখাতে। মুখে একটা হেডমিস্ট্রেস মার্কা হাসি। -“আচ্ছা এখন তোমার নামটা কি জানতে পারি?” জিজ্ঞেস করলো ও। -“হুম। কিন্তু নাম না জেনেই বন্ধু হতে এসেছিলে!” আমি অবাক হলাম। একটু লজ্জা পেল শুনে। -“আমি ইউশা। এখন তো পড়া টা বুঝাও।” পড়া বুঝিয়ে দেয়ার সময় একবার ওর চুল সামনে এসে পরলো। দেখতে খুবই ভাল লাগল। মেয়েটা থেকে দূরে চলে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কেন যেন এখন ভালই লাগছে। -“এইতো পারতেছ। বাকিটা কালকে শিখাবো।”
কিভাবে যে মেয়েটার বন্ধু হয়ে গেলাম বুঝতেই পারলাম না। দূরে সরতে গিয়ে ক্রমশ কাছে এসে পরেছি। এখন প্রায় প্রতিদিনই আমি ক্লাস করতে যাই। ওর পাশে বসতে চাই। না বোঝার ভান করে অনেক সময় পড়া বুঝতে যাই ওর কাছে। কেন যেন ওকে দেখতে খুব ভাল লাগে… ওর কথা, রাগি চোখ, কথা বলার সময় বারবার হাত দিয়ে মুখের উপরে আসা চুলগুলো ঠিক করতে দেখতে ভালো লাগে।
ক্যাম্পাসে বসে ফুচকা খাচ্ছিলাম একা একা। হঠাৎ কোথা থেকে এসে আমার উপর চড়াও হল। হাত থেকে আমার শেষ ফুচকাটা ছিনিয়ে নিয়ে মুখে পুরে দিল। আমি হা করে তাকিয়ে রইলাম। এই কয়েকদিন ওর সাথে মিশে চলিত ভাষাটা ভাল ভাবেই রপ্ত করেছি। বললাম –“এগুলা কি! খাবা জানলে তো কিনেই খাওয়াতাম।” –“ফুচকা তো মানুষ গার্লফ্রেন্ডকে নিয়া খায়। তুমি একলা খাইতেছো কেন?” বলল ও। -“আমার গার্লফ্রেন্ড নাই তো। সুধু একটা বন্ধু আছে।” বিরাস মুখে বললাম। -“আমি আছি কি করতে?” –“কি?” আমি অবাক হলাম। দেখলাম ও একটু মনমরা হয়ে গেল। -“কিছু না। যাই রে। কালকে দেখা হবে।” বলেই দৌড়ে ওর গাড়িতে উঠে গেল। বড়লোক বাবার কারনে ড্রাইভার সহ একটা পাজেরো পেয়েছে ও। আমি একটু চিন্তায় পরলাম ওর এই অস্বাভাবিক আচরণে। তাই আমি চিন্তা করলাম ওকে ট্র্যাক করবো। সেই প্রথম যেদিন দেখেছিলাম সেদিন সুধু একবার ওকে ট্র্যাক করেছিলাম। ট্র্যাক করা বলতে আমি মানুষের ব্রেন বা তার চিন্তার মাঝে ঢুকে যাওয়ার চেষ্টা করি। এক ধরনের সাব ইলেক্ট্রো তরঙ্গ এর মাধ্যমে এটা করে থাকি আমি। তখন আমি মানুষটির চিন্তা বুঝতে পারি, তার ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সে যা দেখতে বা শুনতে পারে আমিও তা পারি, অনেকটা সিন্যাপ্স কানেক্ট হওয়ার মত। আমার টেলিপ্যাথির পাওয়ার অনুশীলনের মাধ্যমে অনেকগুন বাড়িয়ে নিয়েছি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমি মানুষের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারি।
আমি স্মরণীকে ট্র্যাক করলাম। বুজলাম ওর অস্থিরতার কারণ কি। ও আমাকে ভালবাসে। কিভাবে কি হল বুজতেই পারলাম না। নিজের ভিতর থেকেও কে যেন বলে উঠলো আমিও ওকে ভালবাসি। হয়তো ভালবাসি, কিন্তু কোনও দিনও ওকে পাবো না তা ভালো করেই জানি। আমার অভিশাপের ভাগ আর কাউকেই দিতে চাই না।
হঠাৎ মনে হল আমার চারপাশে পৃথিবী কয়েক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেল। দেখলাম স্মরণীর ড্রাইভার অসতর্কভাবে গাড়ি চালাচ্ছে আর সামনে থেকে খুব দ্রুত একটা ট্রাক আসছে। সংঘর্ষ হতে ৫-৬ সেকেন্ড বাকি। ট্রাকের ব্রেক ফেল করেছে। নিজের মাথার মধ্যে স্মরণীর চোখ দিয়ে দেখে অনুভব করলাম আর আমি আমার প্রিয় বন্ধুটাকে দেখতে পারবো না। নিজের মধ্যে মনে হল নতুন একটা শক্তি ভর করেছে। স্মরণীকে টেলিপ্যাথির মাধ্যমে বাইরে ট্রান্সপোর্ট করার চেষ্টা করলাম। আগে কখনো এ জাতীয় কাজ করিনি। অদম্য এক সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম। যা থাকে ভাগ্যে। এতদিন যা পেলাম, শিখলাম তা সবটুকু প্রয়োগ করলাম ওকে বের করে আনার কাজে। মনে হল জ্ঞান হারাব। আমার মনের উপর প্রচন্ড চাপ প্রয়োগ করলাম। শেষ পর্যন্ত সংঘর্ষের ঠিক আগ মুহুর্তে দেখলাম ও গাড়ি থেকে ছিটকে বেরিয়ে এলো এবং আমার পাশে এসে পরলো। তারপর আমি অজ্ঞান হয়ে গেলাম।
২.
মুখে পানির ঝাপটা খেয়ে ধরমর করে উঠে বসলাম। মাথায় প্রচুর যন্ত্রনা হচ্ছে। দেখলাম স্মরণী পানির বোতল হাতে নিয়ে উদ্বিগ্ন ও বিস্মিত মুখে আমার পাশে বসে আছে। কোনো মতে উঠে দাড়ালাম। আমার সারা শরীর ঘামে ভেজা। কিছু দূরে একটা গাড়ি দুমড়ে মুচড়ে আছে। ধোয়া বের হচ্ছে। নিজেকে বিদ্ধস্ত মনে হল। আমার সর্বোচ্চ ক্ষমতার ২য় বারের মত ব্যবহার করে ফেলেছি। চিন্তা করেছিলাম আমার টেলিপ্যাথি সম্পর্কে স্মরণীকে কিছু বলবো না। কিন্তু এখন কিছু করার নেই। যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। ও কি মনে করছে তা আর দেখার ইচ্ছে হল না। পলকের জন্য আমার হারানো অতীত মনে পরে গেল।
-“কাউকে কিছু বলো না দয়া করে। নাহলে আমার অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। আর আমাদের দেখা হবে না। যেভাবে পারো ঘটনাটা সামাল দিও। আর আমার জীবনে কোনো বন্ধু ছিল না, তুমি বাদে। আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ থাকলাম। ভালো থেকো।” বললাম আমি ওকে। ও আমার দিকে তাকিয়ে আছে কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে। কাদতে শুরু করলো হঠাৎ। আমি ওর দিকে তাকিয়ে মাথা নড করে চলে গেলাম।
আমার গোপন আস্তানায় চলে গিয়ে তারাতারি দুইটা ঘুমের ঔষধ খেয়ে শুয়ে পরলাম। আমার গোপন বাসাটা এক রুমের। আমি বাইরে থেকে খাবার এনে খাই। আর নিজের সব কাজ নিজেই করি। তাই কারো সাহায্য দরকার হয় না। আর কেউ জানেও না যে আমি এখানে থাকি। টানা দুইদিন শুয়ে ঘুমিয়ে কাটালাম। মাত্র দুইবার বাইরে গিয়ে খাবার নিয়ে এসেছি।
আজ আমার মাথার যন্ত্রনাটা অনেকটা ঠিক হয়েছে। চিন্তা করলাম কলেজ পাল্টাবো। নাস্তা এনে সবে মাত্র খেতে বসলাম।
এমন সময় কে যেন দরজায় নক করলো। আমি খানিকটা চমকে উঠলাম। এসময় তো কারও আসার কথা না। দরজার কাছে গিয়ে আইহোলে চোখ রাখতেই ভয়ানক চমকে উঠলাম। দরজার ওপাশে স্মরণী দাঁড়িয়ে আছে।
আমি কোনো মতে একটা জামা গায়ে দিয়ে দরজা খুললাম। তোতলাতে তোতলাতে জিজ্ঞেস করলাম –“তুত-তু তুমি এখানে? মানে আমাকে খুজেঁ পেলে কিভাবে?” –“জানি না।” দায়সারা ভাবে উত্তর দিলো। আমি দাঁড়িয়ে আমতা আমতা করতে লাগলাম। চিন্তা করেছিলাম ভিতরে ঢুকতে দেবো না। কিন্তু তিনি আমাকে প্রায় একরকম ধাক্কা দিয়ে ভিতরে ঢুকে গেল। -“এখন বলো।” একটা চেয়ারে বসে বলল ও। -“কি বলবো?” -“আমাকে বাচাঁলে কিভাবে?” -“জানি না।” -“দেখো আমার সাথে মিথ্যা বলবে না।” -“হুহ! আমার টেলিপ্যাথি পাওয়ার আছে।” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম। -“আমাকে আগে বলো নি কেন?” -“যদি আমাকে ছেড়ে চলে যেতে!” -“তোমার কি তাই মনে হয়?” -“জানি নাহ।” -“আমাকে বাচাঁলে কেন?” জেরা করছে যেন আমাকে। -“জানি নাহ।” -“একটা থাপ্পড় দিবো…আবারো মিথ্যা কথা।” কথার জালে আমাকে যেন আটকে ফেলছে। আমি আরেক দিকে ফিরে ফস করে বলে ফেললাম -“তোমাকে ভালবাসি বলে।” -“তাই নাকি। আগে বলো নি কেন?” –“আরে বাবা, জেরা করছো কেন?” –“কেন! তুমি জানো না?” চোখ রাঙ্গিয়ে জিজ্ঞেস করলো। -“হুম! ওইদিনই জেনেছিলাম।”
তারপর কিছক্ষন চুপচাপ বসে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করলো। আমি খাম্বার মত দাঁড়িয়ে আছি ওর সামনে। কি করবো বুজতেছি না। কিছু বলার আগেই স্মরণী বলল –“কিভাবে হল এগুলা?” –“অনেক বড় কাহিনী। তোমার ভালো লাগবে না।” শুধালাম আমি। -“না, তুমি বলো। আমি শুনবো।” নাছোড়বান্দার মত বললো। -“বলতে পারি, এক শর্তে।” -“কি শর্ত?” –“কাউকে কিছু বলতে পারবে না।” –“আমাকে ভালবাসো কেন যদি বিশ্বাস না করো?” –“আমার নিজের জন্য না…তোমার নিজের নিরাপত্তার জন্য।” –“হুম। বলো এখন।” আমি শুরু করলাম আমার হারানো অতীত বলা……
-“আমার টেলিপ্যাথি ক্ষমতা জন্মগত ভাবেই। আমার জন্মের পর থেকে অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে থাকে। আমার বাবা উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান ছিলেন। যার ফলে টাকার প্রাচুর্য ছিল আমাদের। আমার স্মৃতীশক্তি অন্যদের তুলনায় একটু বেশি। তাই এখনো আমার প্রায় সব ঘটনা মনে আছে। যাই হোক, জন্মের পর আমার ক্ষমতার প্রকাশ পেতে থাকে। মাঝেমাঝে কোনো কারণ ছাড়াই আমার চারপাশের জিনিস-পত্র শুন্যে ভাসতে থাকে যখন আমি প্রায় ১০ মাসের। এটা প্রথম দেখে আমাদের বাসার কেয়ারটেকার। উনি চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে যান, পরদিন কাজ ছেড়ে চলে যান।
এভাবে অঘটন ক্রমশ বাড়তে থাকে। আমার মা এটাকে জীনের আছর মনে করেন। কিন্তু আমার বাবা বিজ্ঞানমনস্ক হওয়ায় তিনি আমার এ রোগের বেপারে পড়াশুনা করতে থাকেন। তখন বাড়িতে আমাকে আলাদাভাবে পালন করা হতো একটা আলাদা ঘরে। পরে যার নাম আমি দেই নিষিদ্ধ ঘর। আমার বাবা সবার কাছ থেকে এটা গোপন করে রেখেছিলেন। কিছুদিন পর তিনি আমার বেপারে কিছু করতে না পেরে হাল ছেড়ে দেন। তখন আমার বয়স প্রায় ৮ বছর।
একরাতের ঘটনা। আমি ঘুমিয়ে আছি আর পাশে বাবা টেবিলে বসে আছেন। এমন সময় তিনি খেয়াল করলেন যে একটা কলম শুন্যে ভাসতেছে। তার কাছে তখন এটা স্বাভাবিক বেপার ছিলো। কিছক্ষন পর কলমটার ক্যাপ খুলে পড়লো আর একটা পৃষ্ঠায় কি যেন লিখতে লাগলো নিজে নিজে। লেখা শেষ হলে তা আপনাআপনি নিচে পরে যায়। যে কাগজটায় লেখা হয়েছে বাবা তা হাতে নিয়ে অবাক হয়ে যান। কারণ সেখানে লেখা ছিলো latitude 31’45” N longitude 31’25” E -SEARCH । এই যে কাগজটা।” বলে আমি ওকে সেই পুরোনো কাগজটা দেখালাম।
তারপর আবার বলা শুরু করলাম –“আমার বাবা খানিক্ষন তাকিয়ে থেকে সিদ্ধান্ত নিলেন ওই কাগজে যে স্থানের উল্লেখ আছে ওখানে যাবেন। আমার বাবা আমাকে খুব ভালবাসতেন। তাই আমি যাতে সাধারন মানুষ হতে পারি তার জন্য তিনি সবকিছু করতে প্রস্তুত ছিলেন। তাই একমাসের মধ্যে সব গুছিয়ে তিনি মিসর যান আমাকে আর মাকে সহ। ওইলেখার দ্রাঘিমা আর অক্ষাংশ ছিল মিসরের কোনও এক স্থানের।
মিসরে গিয়ে তিনি সেক্সট্যান্ট দিয়ে মেপে দেখলেন ওটা একটা পিরামিডের পাথরকে নির্দেশ করছে। পাথরের উপরে খুব ছোট করে লেখা SEARCH । পাথরটা ফাঁপা ছিল। ওইটা একটু কষ্ট করে সরাতেই একটা গোপন কুঠুরি পাওয়া যায়। যেখানে ছিল প্যাপিরাসের কাগজে লেখা কিছু লেখা। লেখার বর্ণমালা ছিল দুইভাগে বিভক্ত। একটা ছিল প্রাচীন মিসরিয় হায়ারোগ্লিফিকে আর আরেকটা ছিল… অবিশ্বাস্য হলেও ইংরেজীতে।
৩.
প্যাপিরাসের কাগজটা ছিল একটা দলিল বা উইল এর মত। ওইখানে এক অবিশ্বাস্য কাহিনী বর্ণণা করা হয়েছে। আমার আগেও দুইজন এই পৃথিবীতে এসেছেন যাদের টেলিপ্যাথি পাওয়ার ছিল। একজন মিসরের আরেকজন ইংরেজ ছিলেন। তাদের সম্পর্কে বেশি কিছু লেখা ছিল না। শুধু এইটুকু জানা যায় যে তাদের ক্ষমতা আমার চেয়েও বেশি ছিল। তারা তাদের সময়কার বড় দুইটা ক্রাইসিস মোকাবেলা করেছিলেন তাদের টেলিপ্যাথির সাহায্যে। যে ক্রাইসিস ছিল পৃথিবীর অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরুপ। মিসরের জন আগে আসেন পৃথিবীতে। তিনি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে হালকা পাতলা বলতে পারতেন। তিনি তার পরের জনকে অর্থাৎ ইংরেজ লোকটার জন্য মিসরের ওই একই স্থানে নির্দেশ দিয়ে যান তার সময়ের ক্রাইসিস থামানোর জন্য। তিনি আবার আমার জন্য একি পদ্ধতিতে নির্দেশ দেন। আমাদের তিনজনের আবর্তনকাল প্রথমে ২ হাজার ও পরে তিনশো বছর পর। আমার জন্য যে ক্রাইসিস থামানোর নির্দেশ দেয়া হয় তা সম্পর্কে আমি এখনও কিছু জানি না। থামাতে পারবো কিনা তাও জানি না।
যাই হোক ওইখানে বলা হয়েছে, আমাদের এই ক্ষমতা সাধারণ মানুষ থেকে দূরে রাখতে। SECRET কথাটা খুব গুরুত্ত্ব দিয়ে বলা হয়েছে। আর একটা কথা বলা হয়েছে। একজন টেলিপ্যাথিষ্ট তার জ়ীবনে মাত্র ৩ বার তার ক্ষমতার সর্বোচ্চ সীমা ব্যবহার করতে পারবে। ৩য় বার ব্যবহারের পর সে মারা যাবে। আরো হয়তো কিছু লেখা ছিল ওই দলিলে। পুরোটা আমার কাছে নেই।” বলে কিছক্ষণ বসলাম। এতক্ষণ পায়চারি করতে করতে বলতেছিলাম। তারপর আমার গোপন ড্রয়ার থেকে দলিলটার অংশ বিশেষ দেখালাম স্মরণীকে। -“বাকিটা কই?” ও জিজ্ঞেস করলো আমাকে। আমি বললাম –“জানি না। এক দুর্ঘটনায় হারিয়ে গেছে।” –“তারপর? আঙ্কেল আন্টি কোথায়?” –“আমাকে বাচাঁতে গিয়ে মারা গেছেন।” বলেই আমার মনটা অনেক খারাপ হয়ে গেল। পুরোনো বিভীষিকা আবার মনে পরে গেল।
-“ও স্যরি। আমি জানতাম না।” ও আমাকে সান্তনা দেয়ার ব্যার্থ চেষ্টা করলো। আমি নিজেকে শক্ত করে আবার বলতে শুরু করলাম।
-“ কাগজটার কথা পড়ে আমার বাবা আমার জন্য খুব চিন্তিত হয়ে পরলেন। তিনি চাচ্ছিলেন না যে আমি এসবে জড়াই। টেলিপ্যাথি সম্পর্কে গোপন রাখতে বলা সত্ত্বেও তিনি আমেরিকার বোষ্টন শহরের এক বিখ্যাত ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করেন, আর সেটাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। ওই ডাক্তারের নাম ছিল সাইমন হেক্টর। ওই শয়তানে আমাকে নিয়ে স্টাডি করতে চেয়েছিলো আমার প্রোফাইল পড়ে। তাই বাবা আমাকে নিয়ে বোষ্টনে যান। কিছুদিন স্টাডি করার পর একদিন ডক্টর আমার বাবাকে বললো আমাকে নিয়ে একটা জায়গায় যেতে। জায়গাটা ছিল একটা পরিত্যাক্ত কারখানা। গাড়ি দিয়ে নামার পরে আমাদের কারখানার ভিতরে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রথমে সেখানে শুধু ডক্টর ও তার বডিগার্ড ছিল। আমরা ভিতরে ঢোকার পর কিছু অস্ত্রধারী লোক এসে আমাদের ঘিরে ফেলে।
বাবা এসবের মানে কি তা জানতে চাইলেন। ডক্টর বললো যে তার আমাকে দরকার। আমাকে নিয়ে আমার ব্রেনের উপর গবেষণা করবে। আমার ডিএনএ বিশ্লেষণ করে ক্লোন করা যায় কিনা অথবা সাধারণ মানুষকে টেলিপ্যাথিষ্ট বানানো যায় কিনা তা গবেষণা করবে। তাই তারা আমাকে কিনে নিতে চায়। কিন্তু আমার বাবা না করে দেন এবং তখনই আমাদের নিয়ে বের হয়ে যেতে চান।
কিন্তু শয়তান ডক্টর আমাকে জোর করে ছিনিয়ে নিয়ে আমার চোখের সামনে আমার বাবা-মাকে গুলি করে হত্যা করে।” বলেই আমি আর আমার চোখের পানি আটকে রাখতে পারলাম না। চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় পানি পরতে লাগলো আমার। স্মরণী উঠে এসে আমার পাশে বসে আর কাধে হাত দেয়।
খানিকটা ধাতস্ত হয়ে বললাম –“তারপর আমি আর নিজেকে আটকাতে পারলাম না। মনের ভিতর কেউ তাড়া দিতেই আমি আমার সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করলাম ওখানে থাকা লোকগুলার উপরে। চেয়েছিলাম তাদের ব্রেনের ভিতর ছিন্নভিন্ন করে দিতে। ছোট থাকায় বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারিনি। অজ্ঞান হয়ে পরে যাই। খানিকটা সময় পরে জ্ঞান ফিরলে উঠে দেখি সবাই মরার মত পড়ে আছে। মরে গেছে কিনা তা আর দেখিনি। কোনোমতে কাগজটার কিছু অংশ পেয়ে আর কিছু টাকা পেয়ে আমি ওখান থেকে পালিয়ে যাই।
কয়েকদিন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরি উদ্দেশ্যহীন ভাবে। কি করবো বুজতে পারছিলাম না। তারপর এক ভদ্রমহিলা আমাকে রাস্তা থেকে তার বাসায় নিয়ে যান। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান বিধবা। তিনিই আমাকে কয়েক বছর লালন পালন করে দেশে পাঠান। আমাকে প্রতিমাসে টাকা পাঠান খরচ চালাতে আমার। তিনি আমাকে নিজের ছেলের মতই বড় করেন আর ভালবাসেন। আর আমিও নিজের মায়ের মত তাকে মেনে নিয়েছি, ভালবাসি।
এই হল আমার কাহিনী। আর কিছুই বলার নেই আমার।” বলে থামলাম আমি।
স্মরণী কিছু বললো না। চুপ করে বসে আছে দেখে আমি জিজ্ঞেস করলাম –“কি? এখনো আমাকে ভালবাসবে?” এরপর আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে রইলো যে চোখ দিয়ে আগুন বের হওয়ার উপায় থাকলে আমি পুরে কাবাব হয়ে যেতাম।
নিজেকে অনেকদিন পর একজন সুখি মানুষ মনে হল আমার। -“বাইরে চলো।” এই বলে আমাকে নিয়ে বাইরে ঘুরতে বের হল ও।
৪.
কয়েক দিন পরের ঘটনা। স্মরণীকে আমি চমকে দিতে চেয়েছি। তাই হঠাৎ করে ওর সাথে টেলিপ্যাথির মাধ্যমে সরাসরি ওর ব্রেনের সাথে কথা বললাম। ও প্রথমে খুব চমকে উঠেছিল। তখন আমি ছিলাম আমার আস্তানায় আর ও ওর বাসায়।
-“স্মরণী, আমার কথা শুনতে পারছো?” –“কে? কে কথা বলতেছে?” ও ভেবাচেকা খেয়ে যায়। -“আরে আমি। ভয় পেয় না।” –“ ও আচ্ছা। তুমি! হুহ… খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু এটা কি করে সম্ভব?” –“দুনিয়ার কোনো কিছুই অসম্ভব নয়।” –“হইছে, আর জ্ঞান দেয়া লাগবে না। আজকে ফ্রী আছো?” –“ তোমার জন্য সবসময় আছি মহারাণী!” -“হুমম… সকাল ১০ টায়, পার্কে আসো।” –“জো হুকুম।” বলে আমি যোগাযোগ বন্ধ করলাম। সময় যেন কাটতেই চায় না। ৪০ মিনিট আগে গিয়ে বসে আছি বেঞ্চে। বারবার ঘড়ি দেখতে লাগলাম। শেষে বিরক্ত হয়ে ঘড়ি খুলে ছুরে ফেলে দিলাম।
বসে আছি অনেক্ষণ হল। ১ টার কাছাকাছি বাজে। কিন্তু স্মরণীর দেখা নেই। এখনো আসছে না কেন? আমি চিন্তিত হয়ে পরলাম। পাগলিটা সাধারণত দেরী করে না। কিন্তু আজকে কি হলো? মোবাইল বের করে কল দিলাম। ফোন বন্ধ। টেলিপ্যাথির সাহায্য নিলাম। আশ্চর্য বেপার। ওর কোনো পাত্তা পাওয়া যাচ্ছে না। যেন ওর কোনো অস্তিত্ত্বই নেই। অজানা আতঙ্কে আমার মন ভরে উঠলো।
কিছক্ষণ পর আমার সামনে একটা লোক উদয় হলো হঠাৎ করে। কিছু না বলেই আমার হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়েই তরিঘরি করে চলে গেল। আমি হাতের কাগজটার দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলাম। কাগজে লেখা আছে ইংরেজীতে “স্মরনীকে জীবিত দেখতে চাইলে এই ঠিকানায় একা চলে এসো।” একটা ঠিকানা দেয়া আছে আর হাতের লেখাটা আর কারো না, স্বয়ং ডক্টর হেক্টরের।
আমি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম। আমি একাই যাবো। যা হয় হোক। আমার ওকে বাচাতেই হবে। নিজ জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসি ওকে। একটা হোটেলে ঢুকে তাড়াতাড়ি কিছু খেয়ে নিলাম। কারণ দুপুরের খাওয়া হয় নি। তারপর আমি একটা গাড়ি ভাড়া করে রওয়ানা দিলাম। যেতে প্রায় এক ঘন্টা লাগলো। একটা জংলি জলা জায়গা। মাঝখানে একটা বাড়ি দাড়িয়ে আছে ভুতের আস্তানার মত।
আমি সামনে গিয়ে দাড়াতেই এক নিগ্র এসে আমাকে নিয়ে গেল। আমি পিছন পিছন গিয়ে একটা মোটামুটি অক্ষত রুমে গেলাম। সেখানে গিয়ে দাড়াতেই একজন আমাকে সার্চ করলো। কিছু না পেয়ে নিশ্চিত হয়ে ডক্টরকে ডাকলো।
অনেকদিন আগের মত ঠিক একই ভঙ্গিতে তার আবির্ভাব হল। পিছনে কয়েকজন অস্ত্রধারী লোক ও স্মরণী। সবাই একটা অদ্ভুত ক্যাপ পরে আছে। আমার সামনে এসেই তারা আমাদের অস্ত্র দিয়ে ঘিরে ফেলল। AK 47 বন্দুক। আমি নিজেকে আড়াল করতে পারলেও গুলি চললে স্মরণী ঝাজরা হয়ে যাবে।
আমিই প্রথম কথা শুরু করলাম। -“তুমি বেচে আছো কিভাবে?” আমি হেক্টরকে বললাম। -“ঈশ্বরের দয়ায়। তোমার পাওয়ার আমাকে মৃত্যু পর্যন্ত না নিলেও আমার বাম হাত প্যারালাইজড করে দিয়েছে।” হেক্টর বলল। -“কি চাও? আমাকে কিভাবে খুঁজে পেয়েছো?” –“তোমার ডি এন এ আর ব্রেইন স্ক্যানিং কপি চাই। আর খুজে পাওয়া কোনও বেপার না। আমার সিক্রেট এজেন্টরা তোমাকে খুজে পেয়েছে।”
আমি খানিক্ষণ চুপ করে থাকলাম। ডক্টরের ব্রেনে উকি দিয়ে দেখতে চাইলাম ওর পরিকল্পনা কি। কিন্তু অবিশ্বাস্য বেপার। আমার চারপাশে যেন কারও অস্তিত্ব নেই। মানে আমি ঐখানে কারও ব্রেনের সাথে কানেকশন করতে পারছি না। আমার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমা হল।
-“কি হল ডক, আমি তোমাদের ট্র্যাক করতে পারছি না কেন?” –“এই যে স্পেশাল হেলমেট বানানো হয়েছে তোমার জন্য। তুমি আর আগের মত আমাদের কিছুই করতে পারবে না। এই যে, তোমার সেই কাগজটার বাকি অংশে তা স্পষ্ট ভাবে বলা আছে এটা কিভাবে তৈরী করতে হবে।” বলে আমাকে সেই দলিলটার খোঁয়া যাওয়া অংশটা দেখালো।
আমি এখন বুজতে পারছি। আমার সময়ের ক্রাইসিস আর কিছুই না। স্বয়ং আমি। এখন বুজতে পারছি আমার কি করা লাগবে।
বললাম –“সব পাবে তুমি। আগে ওকে যেতে দাও।” –“না। তা সম্ভব না। আগে তোমার কাজ করতে হবে। তাহলেই ও ছাড়া পাবে।”
বুজতে পারলাম এই শয়তান আমাকে আর ওকে মেরে ফেলবে কাজ শেষ হলেই। তাই যা করার এখনই করতে হবে। আমি আমার উপায় পেয়ে গেছি।
আমি ডক্টরকে বললাম যে আমি স্মরণীর সাথে একটু কথা বলবো। তারপর আমি ওর কাজ করবো। ডক্টর কি যেন চিন্তা করে সম্মতি দিল।
আমি স্মরনীর দিকে তাকিয়ে বললাম –“আমি দুঃখিত স্মরণী। আমাকে যেতে হবে। আমাদের আর দেখা হবে না। হয়ত আমার সিদ্ধান্তটা ভুল। কিন্তু এই ভুলই পৃথিবীকে বাঁচাবে ক্রাইসিসের হাত থেকে। আমাকে ভুল বুঝো না।” বলতে বলতে আমার চোখটা অশ্রুসিক্ত হয়ে গেল। -“বিদায় স্মরণী।” বলেই কাউকে কিছু করার সুযোগ না দিয়ে আমি আমাদের ঘিরে রাখা লোকদের সাথে যে গ্রেনেডগুলো ছিলো তার পিন খুলে ফেললাম নিঃশব্দে আমার টেলিপ্যাথির সাহায্যে। আমার হাতে আর ১৫ সেকেন্ড আছে ওকে ট্রান্সপোর্ট করার জন্যে। যাতে ও নিরাপদে এখান থেকে বের হয়ে বেঁচে যেতে পারে। আমি আমার জীবনে তৃতীয় বারের মত আমার ক্ষমতার সর্বোচ্চ প্রয়োগ করলাম। প্রায় ৩ সেকেন্ডের মাথায় ও গায়েব হয়ে গেল আর আমি চাপ সামলাতে না পেরে মাটিতে বসে পরলাম। হাতে আর ১০ সেকেন্ডের মত আছে। -“কি করলে?” হেক্টর কিছু বুজতে পারছে না। -“কিছু না ডক, মৃত্যুর পথ তৈরী করলাম মাত্র।” হঠাৎ হেক্টর খেয়াল করলো যে গ্রেনেডের পিন খোলা। অজানা আতঙ্ক পেয়ে বসলো তাকে। আর আমি নিশ্চিন্তে দেয়ালে হেলান দিলাম। মাথার যন্ত্রনা ক্রমশ বাড়ছে আর কেমন যেন শীত শীত লাগছে। বিস্ফোরনের সময় হঠাৎ শীতটা বেড়ে গেল আর আমি ছিটকে গেলাম বাড়িটা থেকে। আর পুরো দল নিয়ে হেক্টর মারা গেল।
টিপ টিপ করে আমার মুখের উপর কি যেন পরছে। অনেক কষ্টে চোখ খুলে তাকালাম। দেখলাম স্মরণী আমার মাথাটা ওর কোলে রেখে কাঁদছে। আর ওর চোখের পানি আমার মুখের উপর পড়ছে। আমি হালকা হাসার চেষ্টা করলাম ওর চোখে চোখ রেখে আর একহাত দিয়ে ওর গালে হালকা আদর করলাম। ও ওর ঠোঁটজোড়া আমার কপালের উপর নামিয়ে আনলো। আমার চেতনা আবার ধীরে ধীরে লুপ্ত হতে লাগলো আর মাথার যন্ত্রণাটা কমতে লাগলো। এটাই কি মৃত্যু?
স্মরণীর কথা- এখন প্রায় সবকিছু ঠিক হয়ে যাচ্ছে। ইউশা আমার কোলে অজ্ঞান হয়ে শুয়ে আছে আর আমি ওর সাইন্যাপ্স কানেকশন গুলো পুনর্বিন্যাস করতেছি। শেষ বারের মত ওর ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহারের ফলে নিউরনের মধ্যে আলোড়ন হয় যার ফলে সাইন্যাপ্স কানেকশন গুলো খুলে মারা যেতে পারে। এ জন্যই ওই প্যাপিরাসের কাগজে লেখা ছিল ৩য় বার ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করলে টেলিপ্যাথিস্ট মারা যায়। আর একটা নতুন বিষয়ও লেখা ছিল যে কাগজটা হেক্টরের কাছে ছিলো তাতে। সেখানে বলা হয়েছে যদি টেলিপ্যাথি সম্পূর্ণভাবে কারো উপর প্রয়োগ করা হয় তাহলে যার উপর প্রয়োগ করা হবে সেও ক্ষমতাটা পাবে। তাই দুই দুইবার আমার উপর প্রয়োগ হওয়ায় আমিও এখন টেলিপ্যাথির অধিকারী। আমি হঠাৎ করে বুজতে পারি ইউশা কি করবে। কিন্তু বাধা দেয়ার আগেই ও কাজ করে ফেলে। তাই আমাকে বাধ্য হয়ে ওকে আমার মত ট্রান্সপোর্ট করতে হয়। এখন কিছক্ষণ পর ওর জ্ঞান ফিরবে। আমি ওর দুঃস্বপ্নের মত স্মৃতি মুছে দিয়েছি, যাতে ও আর এসবে মাথা না ঘামায়। আজ বুজতে পারছি সত্যিকারের ভালবাসা কি। এরপর আমরা হয়তো সভ্য সমাজ থেকে অনেক দূরে গিয়ে থাকবো। যেখানে থাকবে ও, আমি আর আমাদের ভালবাসা। যেখানে ছায়ানীল আকাশের বুকে লেখা থাকবে আমাদের এই অসম ভালবাসার কথা।
সমাপ্ত